ক্রীড়া প্রতিবেদক

দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার (৯ জুন) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃষ্টি-বিঘ্নিত ম্যাচে ডিএলএস পদ্ধতিতে ৮৬ রানের দাপুটে জয় তুলে নিয়েছে টাইগাররা। ২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দাপুটে জয়ের পর ওয়ানডেতে অজিদের হারানোর স্বাদ পেল বাংলাদেশ।

টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই ফিরে যান ওপেনার সাইফ হাসান। তবে এরপর তানজিদ হাসান তামিম ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেন। দ্বিতীয় উইকেটে তাঁদের ৯৬ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসের ভিত গড়ে দেয়।

আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ৪৪ বলে ৫৪ রান করে তানজিদ আউট হলে আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা। শান্তও ৮৬ বলে ৬৭ রান করে ফিরে গেলে বড় সংগ্রহের আশা কিছুটা ফিকে হয়ে যায়।

ঠিক তখনই দলের হাল ধরেন মোসাদ্দেক হোসেন। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর সুযোগ পেয়েই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন এই অলরাউন্ডার। অন্য প্রান্তে তাওহিদ হৃদয় ও পরে মেহেদী হাসান মিরাজ দ্রুত আউট হলেও শেষ পর্যন্ত ইনিংসের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখেন মোসাদ্দেক।

ফিফটি পূরণের পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি। এক ওভারে অ্যাডাম জাম্পাকে টানা তিন বলে বাউন্ডারি মেরে রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেন। শেষদিকে টেলএন্ডারদের নিয়ে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার কঠিন দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেন। অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডাররা তাঁকে চারবার জীবন দিয়েছেন। সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ৭০ বলে ৭ চার ও ৩ ছক্কায় অপরাজিত ৮২ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন মোসাদ্দেক।

তাঁর ব্যাটে ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের লড়াকু সংগ্রহ দাঁড় করায় বাংলাদেশ।

২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই বাংলাদেশের পেস আক্রমণের সামনে দিশেহারা হয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। ইনিংসের প্রথম বলেই তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত ইনসুইংয়ে বোল্ড হয়ে ফেরেন ম্যাথু শর্ট। পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের শিকার হন মার্নাস লাবুশেন। মাত্র ২ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে বড় চাপে পড়ে সফরকারীরা।

এরপর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন কুপার কনোলি ও জশ ইংলিস। কিন্তু সেই জুটি ভেঙে দেন নাহিদ রানা। ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির ধারাবাহিক বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের একের পর এক বিপাকে ফেলেন তিনি। তাঁর তীব্র গতি ও বাউন্সারের সামনে স্বস্তিতে ব্যাট করতে পারেননি কেউই।

ইংলিসকে আউট করার পর নাহিদের উদযাপন ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরো ম্যাচজুড়েই তাঁর আগ্রাসী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করে।

পরে অ্যালেক্স ক্যারি ও কুপার কনোলি চতুর্থ উইকেটে ৪০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আবারও আঘাত হানেন নাহিদ। ৪৭ রান করা ক্যারিকে উইকেটরক্ষক লিটন দাসের ক্যাচে পরিণত করে প্রতিপক্ষের আশা আরও ক্ষীণ করে দেন তিনি।

১০ ওভারে মাত্র ৪১ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা বোলিং করেন নাহিদ রানা। তাসকিন, মোস্তাফিজুর ও অন্য বোলারদেরও ছিল কার্যকর অবদান। ৭০ বলে ৮৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতে ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত।

শেষদিকে ক্যামেরন গ্রিন ৬৬ বলে ৫২ রানের লড়াকু ইনিংস খেললেও ম্যাচের গতিপথ বদলাতে পারেননি। বৃষ্টি ও সময়ক্ষেপণের কারণে খেলা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশের জয় নিয়ে আর কোনো সংশয় ছিল না।

অবশেষে ডিএলএস পদ্ধতিতে ৮৬ রানের জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। কার্ডিফের ঐতিহাসিক জয়ের দুই দশকেরও বেশি সময় পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সাফল্য শুধু একটি জয় নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাস ও সামর্থ্যের নতুন ঘোষণা।

 বিশ্বকাপের আগে এমন একটি জয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ দলকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করবে এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাশক্তিগুলির বিপক্ষে লড়াই করার বিশ্বাস আরও দৃঢ় করবে।

Share.
Exit mobile version