রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি এখন পুরোপুরিই মাদকসেবীদের দখলে চলে গেছে। দিনের আলো শেষ হতেই এখানে চলে নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড। দেহপসানিরা খদ্দের নিয়ে ঢুকে যায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে। শুরু হয় আদিম খেলা। টহল পুলিশ এসব দেখেও কিছু বলেন না। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়। নগরীর দুই রেলগেট এলাকায় রেলওয়ের জমিতে গড়ে উঠা একটি দ্বিতল ভবন। মাত্র দুই বছর আগেও এ কার্যালয়টি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে প্রতিদিন কোনো না কোনো অনুষ্ঠান হতে দেখা যেতো।
যারফলে প্রতিদিনই হাজির হতেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর হয়ে থাকতো ভবনটি। এ কার্যালয়কে কেন্দ্র করে হতো তদবির বাণিজ্যও। তবে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বদলে গেছে সেই চিত্র।
চকচকে সেই ভবনে এখন কেবলই ধ্বংসাবশেষ। ভবনের নিচ ও উপরতলার দরজা-জানালাবিহীন কক্ষগুলোতে অবাধে যাতায়াত শুরু করেছে ভবঘুরে বা ছিন্নমূল মানুষ ও মাদকসেবীরা। রাত হলে এখানে চলে মাদক সেবনসহ অনৈতিক কর্মকান্ডও।
মাত্র দুই তলাবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বাইরে থেকেই ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ চোখে পড়ে। জুলাই অভ্যুত্থানে ভবনটিতে দুই দফা হামলা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে সেখানে ভবনটি ছাড়া কোনও কিছুই অবশিষ্ট নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভবনটির পাশের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি এই এলাকায় প্রায় ২০ বছর ধরে ব্যবসা করি।
৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের এই অফিস কীভাবে ভাঙচুর করে ধ্বংস করা হয়েছে, তা নিজের চোখে দেখেছি। সেদিন অন্তত ২০০-২৫০ জন লোক এসে পুরো ভবন তছনছ করে গেছে। ভবনের যাবতীয় সব আসবাব নিয়ে গেছে। কিছু কিছু আসবাব রাস্তায় নিয়ে আগুন জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের উপর মানুষের এতো ক্ষোভ আগে বুঝিনি।’
শিপন নামের এক পথচারী বলেন, ‘গত ১৬ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীরা অন্তত তাদের কার্যালয়ে যেতে পারতো, কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের যেই পরিণতি হয়েছে তা কল্পনাতীত। কে ভেবেছিল আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের এমন পরিণত হবে। এতোগুলো মানুষ মারার কারণে আওয়ামী লীগে অফিসের এই পরিণতি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর যে নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার ফল এখন আওয়ামী লীগ পাচ্ছে। তাদের ফেরার কোনও পথ দেখছি না। তারা যদি নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হয়, তাহলে এই দেশের মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না।’
ভবনটির ভেতরে প্রবেশের পর দেখা যায়, নিচতলার পুরো ফ্লোরে ময়লা–আবর্জনার স্তুপ। এর মাঝেই একজন ভবঘুরে মানুষ শুঁয়ে আছে। কয়েকবার ডাক দেওয়ার পরও তিনি চোখ মেলতে পারলেন না। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখা গেল তিনজন ভবঘুরে বা ছিন্নমূল শিশু। যাদের বয়স আনুমানিক ১২ থেকে ১৩ হবে। এই তিনজন শিশুর মধ্যে একজন মেয়ে। মেয়েটি অপর দুই জন ছেলে শিশুদের খাবার খাইয়ে দিচ্ছে আর একটি অফিস কক্ষে আরেকজন ভবঘুরে মানুষ দাড়িয়ে প্রস্রাব করছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দেড় বছর ধরেই তারা এখানে অবস্থান করছেন। বলা চলে তাদের ঘরবাড়ি এখন এই ভাঙাচোরা কার্যালয়।
এছাড়া দ্বিতীয় তলার প্রতিটি কক্ষে বিশেষ করে শৌচাগারগুলোতে ময়লা আর্বজনার পাশাপাশি মাদক সেবনের বিপুল পরিমান সরঞ্জাম পড়ে থাকতে দেখা যায়। দিনের বেলায় মাদকাসক্তদের তেমন আনাগোনা চোখে না পড়লেও সন্ধ্যা হলেই মাদকাসক্ত এবং যৌনকর্মীদের আনাগোনা বেড়ে যায় এ কার্যালয়ে। পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে কারবারিরা এখানে অবাধে মাদক বিক্রি ও সেবন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের আশেপাশে গড়ে উঠা বেশ কয়েকটি রেষ্টুরেন্ট মালিক ও তাদের ওয়েটারদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, এ কার্যালয়টি এখন মাদকসেবি ও পতিতাদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই ওরা এখানে মাদক সেবন করে। ওদের হাতে দাড়ালো ছুরি থাকে।
মাঝেমধ্যে ওরা নিজেরাই নিজেদেরকে ছুরি দিয়ে পোছাপুছি করে। সারাক্ষণ মাদকাসক্ত থাকায় ওদের কোন বোধ থাকে না। ওরা সব ধরণের নেশা করে। ইয়াবা ট্যাবলেট, গাজা আর সবচেয়ে বেশি খায় আঠা জাতীয় নেশা। আঠা খেয়ে সবসময় আওয়ামী লীগ অফিসে পড়ে থাকে।
রেষ্টুরেন্ট ওয়েটাররা বলেন, এমন নেশা-পানি আর অনৈতিক কাজ হয় দেখে একজন অফিসের দরজায় টিন লাগিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু ওরা সেই টিন খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। কেউ কিছু বললে, ছুরির ভয় দেখায়। ওরা নেশাগ্রস্থ মানুষ, ওদেরতো কোন সেন্স নেই। ওরা যা খুশি তা করতে পারে। যদি কোন এক অঘটন ঘটাইয়া ফেলে তাহলেতো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই আমরা বা কেউ কিছু বলে না। ওদেরকেতো পুলিশেও নিতে চায় না। তাহলে আমরা কি করবো বলেন?
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আব্দুল মান্নান বলেন, আমি এ থানায় নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানাছিলো না। অবশ্যই যদি কোথায় মাদকসেবন এবং অনৈতিক কাজ চলে তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

Share.
Exit mobile version