নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের কোরবানির পশুর বাজার এখন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মৌসুমি গ্রামীণ অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে। ঈদুল আজহা ২০২৬ উপলক্ষে দেশে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। ফলে প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৯০ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ছাগল ও ভেড়া। এতে দেশে কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির অর্থনীতি এখন শুধু পশু কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের লাখো গ্রামীণ পরিবার এবং বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট খাতে মৌসুমি আয়ের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।

প্রতি বছর কোরবানির মৌসুম ঘিরে পশুপালন, পশুখাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ, ভেটেরিনারি সেবা, পরিবহন, অস্থায়ী শ্রমবাজার, কসাই সেবা, চামড়া সংগ্রহ এবং ট্যানারি ও চামড়াশিল্পে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়।

জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপিতে এ খাতের অবদান ছিল ১ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। ওই সময়ে খাতটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬৭১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন টাকা।

ঈদুল আজহা সামনে রেখে সরকার লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দামও নির্ধারণ করেছে। ঢাকায় প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখা যায়।

মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ রোববার বলেন, দেশের খামারি ও র‍্যাঞ্চ মালিকদের উৎপাদিত গরু, ছাগল ও মহিষ জাতীয় চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্তের চেয়েও বেশি।

হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়া পশু নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবক দল বড় হাটগুলোতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, দেশে এখনও পশু কেনাবেচা মূলত দর-কষাকষিনির্ভর। পশুর স্বাস্থ্য, গঠন, আকার ও বাহ্যিক অবস্থা বিবেচনায় দাম নির্ধারিত হয়। ফলে কৃত্রিম সিন্ডিকেট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, কারণ বাজারমূল্য মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।

এদিকে দেশের ডিজিটাল পশুর বাজারও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো এখন গ্রামীণ খামারি ও শহুরে ক্রেতাদের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করছে।

যদিও অধিকাংশ বেচাকেনা এখনও প্রচলিত পশুর হাটে হয়, তবুও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ছে। খামারভিত্তিক ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ এবং সরকার-সমর্থিত ডিজিটাল হাট এখন কোরবানির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধি, মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার এবং শহুরে ক্রেতাদের সুবিধার চাহিদা বাড়ায় অনলাইন পশু বিপণনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বিগুণ হারে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

ডিজিটাল পশুর বাজারে ক্রেতারা ছবি ও ভিডিও দেখে পশু নির্বাচন, দাম তুলনা এবং অনেক ক্ষেত্রে বাসায় সরবরাহ ও মোবাইল পেমেন্টের সুবিধা পাচ্ছেন। বিকাশ ও নগদ-এর মতো সেবার মাধ্যমে অর্থ লেনদেনও সহজ হয়েছে।

তবে দ্রুত প্রসার ঘটলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট কোরবানির পশু বিক্রির তুলনায় ডিজিটাল বাজারের অংশ এখনও সীমিত। কারণ অধিকাংশ ক্রেতাই সরাসরি পশু দেখে, যাচাই করে এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রচলিত হাট থেকেই পশু কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

Share.
Exit mobile version