নিজস্ব সংবাদদাতা

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষের চিরচেনা ঈদযাত্রার শুরুতেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক ভয়াবহ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বকেয়া বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস পরিশোধের দাবিতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার চৈতী গার্মেন্টসের শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার টিপরদী এলাকায় শুরু হওয়া এই অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় লেনে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র ও স্থবির যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে উৎসবের মৌসুমে বাড়ি ফেরা হাজার হাজার যাত্রী ও পরিবহন চালক তীব্র গরমের মধ্যে সড়কে আটকে থেকে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, সোনারগাঁ পৌরসভার টিপরদী এলাকায় অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান চৈতী গ্রুপের ‘চৈতী গার্মেন্টস’-এর হাজারো শ্রমিক দুপুরের দিকে কারখানার ভেতর থেকে বের হয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মহাসড়কের দুটি লেনের ওপর আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে ও বসে পড়ে অবরোধ সৃষ্টি করলে তাৎক্ষণিকভাবে চারদিকের যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

শ্রমিকদের দাবি, গত এপ্রিল ও মে মাসের বকেয়া বেতন এবং উৎসব বোনাস ঈদের ছুটির আগেই সম্পূর্ণ পরিশোধ করার কথা থাকলেও আজ গার্মেন্টস মালিকপক্ষ তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তারা অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমে আসেন। শ্রমিকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের শতভাগ পাওনা বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন ও অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

মহাসড়কে আকস্মিক এই অবরোধের ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রুটের সংযোগস্থল মদনপুর থেকে শুরু করে মেঘনা ঘাট পর্যন্ত দূরপাল্লার শত শত যাত্রীবাহী বাস, প্রাইভেটকার ও পণ্যবাহী ট্রাক অলস দাঁড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে চাকা না ঘোরায় অনেক নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রী বাসের ভেতরেই অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। নিরুপায় হয়ে অনেক ঘরমুখো মানুষকে ব্যাগ-লাগেজ মাথায় নিয়ে মহাসড়ক দিয়েই পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে দেখা যায়।

মদনপুর এলাকায় টানা তিন ঘণ্টা বাসে আটকে থাকা দোয়েল পরিবহনের এক ভুক্তভোগী যাত্রী বহুলুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঢাকা থেকে আনন্দের সাথে রওনা দিয়েছিলাম পরিবারের সাথে ঈদ করতে। কিন্তু দুপুরের পর থেকে মদনপুরে এসে আটকে আছি, গাড়ি একটুও নড়ছে না।” মহাসড়কে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকা ট্রাকচালক রফিক মিয়াও জানান, সকালে রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা থাকলেও দুপুরের পর থেকে হঠাৎ এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে জাতীয় মহাসড়কে শ্রমিকদের দীর্ঘ অবরোধ ও বিপুল যানজটের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত, সোনারগাঁ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম সারোয়ার এবং কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি শামীম শেখ। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছেই পরিস্থিতি সামাল দিতে চৈতী গার্মেন্টসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন।

পরবর্তীতে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করিয়ে দেওয়ার জোর আশ্বাস দেন। কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি শামীম শেখ বিকেল সাড়ে ৩টায় জানান, ঈদযাত্রীদের চরম দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে শ্রমিকদের শান্ত করার এবং অবরোধ তুলে দিয়ে মহাসড়কে পুনরায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ও যৌথ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

Share.
Exit mobile version