বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে মরণোত্তর অঙ্গদান কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাদের মতে, উন্নত দেশগুলোতে মরণোত্তর অঙ্গদানই কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রধান উৎস হলেও আইনি জটিলতা ও সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশে এখনো এই ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।
সোমবার (২৯ জুন) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘৬ষ্ঠ বাংলাদেশ-কোরিয়া ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘জীবন্ত এবং মৃত দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন, ২০২৬’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন।
সেমিনারে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান, উন্নত বিশ্বে ‘ব্রেইন ডেথ’ হওয়া রোগীদের অঙ্গ সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনের জন্য সুসংগঠিত আইনি কাঠামো এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুর আগে অঙ্গদানের অঙ্গীকার করার সংস্কৃতিও সেখানে ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
তাদের মতে, জীবিত নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে কিডনি নেওয়ার ক্ষেত্রে দাতার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়। এ কারণেই উন্নত দেশগুলোতে মরণোত্তর অঙ্গদানকে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে অন্তত ১০ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে বছরে গড়ে মাত্র ২৫০ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।
আইনি জটিলতা ও দাতা সংকটের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন রোগীদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।
সেমিনারে আরও জানানো হয়, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন প্রণয়ন করা হলেও ২০১৮ সালের সংশোধনের পরও তা বর্তমান চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। বর্তমানে নির্ধারিত ২৩ জন নিকটাত্মীয়ের বাইরে অন্য কারও কাছ থেকে কিডনি গ্রহণের সুযোগ নেই, যা দাতা সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৮৫ কোটির বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো জানেন না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রতিস্থাপনের সুযোগ না বাড়লে আগামী বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সেমিনারে বক্তারা দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন বাড়াতে আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি মরণোত্তর অঙ্গদান বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

