‘রোগতাত্ত্বিক ত্রিভুজ’—জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ত্রিভুজের তিনটি বাহু হলো জীবাণু (ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এডিস মশা), রোগী এবং পরিবেশ। ত্রিভুজের যেকোনো একটি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। তবে এ বছরের অক্টোবর মাসে দেখা গেছে, তিনটির কোনোটি নিয়ন্ত্রণে নেই। এডিস মশার বিস্তার কমেনি, পরিবেশ অনুকূল রয়েছে, আর রোগীর সংখ্যা বেড়েছে দ্রুত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “অক্টোবরের শেষের বৃষ্টিপাত আমাদের ভোগাবে। নভেম্বরে ডেঙ্গুর বিস্তার কমার সম্ভাবনা নেই। রোগতাত্ত্বিক ত্রিভুজ রুখে দেওয়ার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। গ্রামে-গঞ্জে এডিস ছড়িয়ে পড়েছে, অথচ স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। এটি ভীতির কারণ।”
অক্টোবর মাসে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দুই দিক থেকেই সর্বোচ্চ। পুরো মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৫২০ জন, মারা গেছেন ৮০ জন। শুধু গত বুধবারই এক দিনে বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০৩ জন, তবে কোনো মৃত্যুর খবর নেই।
চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২৭৮ জন, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৯ হাজার ৮৮৬ জন। গত বছরের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬১ হাজার ৮১৭ এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৯৭ জনের।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু দুই মাস ধরে বাড়ছে। জুনে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর জুলাইয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। আগস্টে কিছুটা কমলেও সেপ্টেম্বরের সংখ্যা আবার বেড়ে যায়। সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত ছিলেন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন, অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজারের বেশি।
এবার ডেঙ্গুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ঢাকার বাইরে রোগী বেড়েছে বেশি। মোট আক্রান্তের মধ্যে ঢাকায় ২৮ শতাংশ। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ঢাকায় রোগী বাড়তে শুরু করেছে। ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, “অক্টোবরের মধ্যে ঢাকায় রোগীর সংখ্যা সেপ্টেম্বারের তুলনায় অন্তত ১৫ শতাংশ বেড়েছে। ঢাকায় ভর্তি রোগীদের অন্তত অর্ধেকই ঢাকার বাইরে বসবাস করেন।”
নারায়ণগঞ্জে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৩০, অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১০। গাজীপুরে সেপ্টেম্বরে রোগী ছিলেন ১ হাজার ৬৬১, অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৯৯৩।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বিস্তারে প্রধান তিনটি কারণ—অব্যাহত বৃষ্টি, উচ্চ তাপমাত্রা এবং স্থানীয় সরকারের অকার্যকরতা। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার বলেন, “এই বছর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে এবং তাপমাত্রা কমেনি, যা মশার প্রজননের জন্য উপযুক্ত। এছাড়া ভঙ্গুর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও নিয়ন্ত্রণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের শীত ডেঙ্গু কমাতে যথেষ্ট নয়। জানুয়ারিতেও দিনের তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতের তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকে, যা মশার প্রজননে বড় বাধা সৃষ্টি করে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত তিনটি বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া ৬ থেকে ৭ নভেম্বর সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণে আরও বৃষ্টি সম্ভাবনা আছে। বৃষ্টি হলে নতুন এডিস মশা জন্ম নেবে, যার সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পৌঁছতে সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ দিন। ফলে নভেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার সম্ভাবনা কম এবং এর প্রভাব ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকতে পারে।

