নিজস্ব প্রতিবেদক

আত্মত্যাগ, পরম উৎসর্গ ও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে সারা দেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা, গভীর ভাবগাম্ভীর্য এবং অনাবিল আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা।

হিজরি বর্ষপঞ্জির জিলহজ মাসের ১০ তারিখের এই ‘কোরবানির ঈদ’-কে কেন্দ্র করে আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে)  সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। লৌকিকতার ঊর্ধ্বে উঠে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হতে সকাল থেকেই বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দান ও জামে মসজিদগুলোতে ঢল নামে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলিমের।

রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। নিশ্ছিদ্র ও কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আয়োজিত এই প্রধান জামাতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিবিদ, পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন।

নামাজ শেষে মোনাজাতে দেশ, জাতি ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি এবং স্থিতিশীলতা কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। নামাজ সমাপনান্তে খতিবগণ তাঁদের খুতবায় কোরবানির ঐতিহাসিক তাৎপর্য, ত্যাগের প্রকৃত শিক্ষা এবং ইসলামের মানবিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এরপর চিরচেনা বাঙালি ঐতিহ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঈদের কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মুসল্লিরা।

ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় পশু কোরবানির মূল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। সামর্থ্যবান মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ আঙিনা বা নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি করছেন। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, পবিত্র ঈদুল আজহার সাথে জড়িয়ে আছে আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় ও অগ্নীপরীক্ষার ঘটনা।

আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন নিজের সবচেয়ে প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, তখন তাঁর সেই অবিচল আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে পরম করুণাময় শেষ মুহূর্তে কুদরতি উপায়ে হযরত ইসমাইলের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি করিয়ে দেন। ইতিহাসের সেই সর্বোচ্চ ত্যাগের স্মৃতিকে চির অম্লান রাখতেই মুসলিম বিশ্বে কোরবানির এই বিধান আজ অব্দি জারি রয়েছে।

পবিত্র এই উৎসব উপলক্ষে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তাঁরা কোরবানির ত্যাগের শিক্ষাকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত করার আহ্বান জানান। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানরাও দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

ঈদ উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করছে দিনব্যাপী বিশেষ ঈদ অনুষ্ঠানমালা। এছাড়া মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি এতিমখানা ও শিশু সদনগুলোতে  উন্নত ও বিশেষ খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।

এবারের ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ মানুষের মাঝে দীর্ঘ ছুটির এক আনন্দময় আমেজ বিরাজ করছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রজ্ঞাপন ও নির্বাহী আদেশের অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত হওয়ায় গত ২৫ মে থেকে শুরু হওয়া এই ঈদ ছুটি আগামী ৩১ মে পর্যন্ত বহাল থাকবে।

দীর্ঘ এই ছুটির সুযোগে লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ ঢাকা ছেড়ে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে প্রিয়জনদের সাথে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন, যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এক বিশাল প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

Share.
Exit mobile version