মাদকের আগ্রাসন, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই রুখতে নারায়ণগঞ্জে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন। ‘কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী’ নীতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করছেন জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানে সামাজিক সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। এসব নিয়ে দৈনিক দেশের আলো ও দেশের আলো ডিজিটাল-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক ফিরোজ আহমেদ।
মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
হাবিবুর রহমান: মাদক নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে জেলার প্রতিটি থানায় পৃথক টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এসব টিমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযান ও অপারেশনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিশেষ অভিযান দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে আপনাদের মূল কৌশল কী?
হাবিবুর রহমান: আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যেখানে সমস্যা, সেখান থেকেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা পুলিশের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর সাত থানায় ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানে ৩২৮ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য এসেছে। এত বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন হলো কেন?
হাবিবুর রহমান: মাদক, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে আমরা শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযানেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না; সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্যও কাজ করতে চাই।
১৫ সেপ্টেম্বরের সমন্বিত অভিযানে মাদক-সংশ্লিষ্ট, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসহ ১০১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এই অভিযান থেকে কী বার্তা দিতে চান?
হাবিবুর রহমান: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাদক, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূলসহ ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের আরও কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
হাবিবুর রহমান: মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। কারণ, পুলিশের একার পক্ষে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হলেও তারা আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তাই এ সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ ও অভিযানই কি যথেষ্ট?
হাবিবুর রহমান: না, শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক থেকেই সমাজে বিভিন্ন অপরাধের সৃষ্টি হয়। তাই শুধু মাদক ব্যবসায়ী বা সেবনকারীকে আইনের আওতায় আনলেই হবে না; সমাজকে সামগ্রিকভাবে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
তাহলে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পুলিশের বাইরে অন্যদের কী ভূমিকা থাকা প্রয়োজন?
হাবিবুর রহমান: মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। পুলিশের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদক কোথায় ছড়াচ্ছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত—এসব বিষয়ে সামাজিক সহযোগিতা থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।
মাদক থেকে তরুণদের দূরে রাখতে কী ধরনের সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করেন?
হাবিবুর রহমান: দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য খেলার মাঠ, পড়াশোনার উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশসহ তরুণদের সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। এর মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়তা করা সম্ভব।
মাদকের সঙ্গে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইয়ের সম্পৃক্ততা কতটা দেখছেন?
হাবিবুর রহমান: মাদক, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ প্রশাসনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তারই কি যথেষ্ট বলে মনে করেন?
হাবিবুর রহমান: শুধু আইনি ব্যবস্থা নিলেই হবে না। তরুণদের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাদের পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একটি প্রজন্মকে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে পারলে মাদক ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
ছিনতাই নির্মূলে জেলা পুলিশের বিশেষ কোনো বার্তা আছে?
হাবিবুর রহমান: মাদক, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই নির্মূলে জেলা পুলিশ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। যেখানে সমস্যা পাব, সেখান থেকেই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করব। সেই লক্ষ্যে আমাদের কার্যক্রম শুরু করেছি।
আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর যেভাবে অভিযান শুরু হয়েছে, তাতে আপনার অগ্রাধিকার কি শুধু আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনও?
হাবিবুর রহমান: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা অবশ্যই আমাদের দায়িত্ব। তবে শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে হবে না; সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দিকেও নজর দিতে হবে। সে কারণেই বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করছি এবং সামাজিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।
শেষ প্রশ্ন—নারায়ণগঞ্জবাসী মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং নিয়ে আপনার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করতে পারে?
হাবিবুর রহমান: আমি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। সময় বলে দেবে আমি মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কতটুকু করতে পারলাম। আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

