নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত শিপব্রেকিং শিল্প এখন আন্তর্জাতিক মানের ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং’ খাতে রূপান্তরিত হয়েছে। এর ফলে এই খাত বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ১৭টি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থা (আইএমও)-এর অনুমোদন পাওয়ায় বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি আইএমও-এর হংকং কনভেনশনের আওতায় প্রকাশিত বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের ১৭টি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাহাজ পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম নিশ্চিত করার স্বীকৃতি হিসেবেই এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।

তুরস্ক ১৮টি অনুমোদিত ইয়ার্ড নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও পাকিস্তান এই তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে পরিবেশবান্ধব শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একসময় পরিবেশ দূষণ, শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের শিপব্রেকিং শিল্প আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই খাতের উদ্যোক্তারা আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ইয়ার্ড আধুনিকায়ন, শ্রমিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্যোক্তারা ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের অনুমোদনের পর আইএমও এই ১৭টি ইয়ার্ডকে ২০৩০ সালের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বৈধতা দিয়ে বৈশ্বিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্বের বড় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখন বাংলাদেশে পুনর্ব্যবহারের জন্য আসতে আগ্রহী হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০টি পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে আরও কয়েকটি ইয়ার্ড চলতি বছরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।

সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে এই সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক অর্জন নয়, বরং পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানো সম্ভব—বাংলাদেশ তারই একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

Share.
Exit mobile version