মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশন টকশো একটি সময় ছিল দর্শকদের অন্যতম আকর্ষণ। নাগরিক সমাজ, রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ, এমনকি সাধারণ দর্শকও এই আলোচনায় যুক্ত হতেন তথ্য, যুক্তি ও মতবিনিময়ের প্রত্যাশায়।

আমি প্রায় উনিশ বছর ধরে বেসরকারি টেলিভিশনে টকশো প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত আছি। এই দীর্ঘ সময়ে রাজনীতির গতিধারা, টেলিভিশন সাংবাদিকতার উত্থান-পতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন—সবই প্রত্যক্ষ করেছি নিবিড়ভাবে।

টকশো মূলত একাধিক পক্ষের অংশগ্রহণে গঠিত বিতর্ক বা বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠান, যেখানে তর্ক-বিতর্ক ও তথ্যের মাধ্যমে দর্শক রাজনীতি ও সমাজের নানা দিক অনুধাবন করেন। নব্বইয়ের দশকের শেষে ও দুই হাজার দশকের শুরুতে বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর উত্থানের সঙ্গে টকশোও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এই প্ল্যাটফর্ম বহুদিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকল্প মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। মানুষ সরাসরি রাজনীতিবিদদের বক্তব্য শুনেছে, প্রশ্ন তুলেছে, প্রতিবাদ জেনেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মঞ্চের চরিত্র পাল্টে গেছে—একদিকে নিয়ন্ত্রণ ও ভয়, অন্যদিকে বাণিজ্যিক মোহ।

বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে টকশো ও মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টাগুলো ছিল প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষ। ‘আইনি কাঠামো’ ও ‘শৃঙ্খলা রক্ষার’ নামে মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত করা হয়। সমালোচনামূলক বক্তব্য বা ভিন্নমতের অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো অনেক সময় প্রযোজক-উপস্থাপকদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি নিজেই বহুবার এমন অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে অতিথির বক্তব্যের কারণে শো বন্ধ হয়ে গেছে, কিংবা চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি সময় ছিল যখন দর্শকরা টকশোতে উত্তেজনাপূর্ণ ও বহুপক্ষীয় বিতর্ক দেখতে পেতেন। কিন্তু সরকার-সমর্থিত একতরফা আলোচনায় দর্শক ধীরে ধীরে বিমুখ হয়ে পড়েন।

বিরোধী মতের অতিথি আনা মানে ছিল জবাবদিহিতার কঠিন চ্যালেঞ্জ। গণমানুষের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলার সুযোগ যেমন কমেছিল, তেমনি ‘রাষ্ট্রের সমালোচনা মানেই দেশবিরোধিতা’—এমন মানসিকতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারা সরকার ও রাষ্ট্রকে এক কাতারে দাঁড় করেছিল। বিষয়টা এমন যে, সরকার মানেই রাষ্ট্র।

মনে পড়ে, সময় টিভির এক আলোচিত টকশোতে সেনাপ্রধানকে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মন্তব্যের জেরে যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ উদাহরণ। একইভাবে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের এক মন্তব্যের পর সরকারের প্রতিক্রিয়া—টকশো ও মিডিয়ার স্বাধীনতার ওপর কতটা চাপ ছিল, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সরকার তখন রাষ্ট্র ও দলকে এক করে ফেলেছিল। ফলস্বরূপ, গণমানুষের পক্ষে কথা বলাটাই রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বাংলাদেশের টকশো উপস্থাপনা বহু সময় পশ্চিমা ধাঁচের ‘হার্ডটক’ মডেল অনুসরণ করেছে। বিবিসির উপস্থাপক টিম সেবাস্টিয়ানের মতো সরাসরি প্রশ্ন করার ঢং অনেকেই রপ্ত করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই সততা ও সাংবাদিকতার সাহস তাঁরা ধারণ করতে পারেননি।

অনেকেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বা কর্পোরেট স্বার্থে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। একসময় আমরা উপস্থাপক খালেদ মহিউদ্দিনকে সমালোচনামূলক প্রশ্ন করার জন্য প্রশংসা করেছিলাম। পরে দেখা গেল, তিনিও এক বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি নরম মনোভাব পোষণ করছেন।

আবার ফ্যাসিস্ট চরিত্রের রাজনৈতিক নেতাকে সাক্ষাৎকার দেওয়া পেশাগতভাবে অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু যদি তার মধ্যে ‘কুরাজনীতি, অসততা ও ভিউ-বাণিজ্যের লোভ’ থাকে, তাহলে সেটি সাংবাদিকতার নৈতিকতা ভঙ্গ করে।

বর্তমান সময়ের অনেক টকশোতে দেখা যায়, উপস্থাপক বা উপস্থাপিকা নিরপেক্ষতার মুখোশে ফ্যাসিস্ট পক্ষের ভাষা ও আচরণ বহন করছেন। মুখভঙ্গি, প্রশ্নের ধরন, অথবা অতিথি নির্বাচন—সবকিছুতেই যেন পরিকল্পিত দলবাজির ছাপ।

আওয়ামী শাসনামলের চ্যানেলগুলির (যেমন চ্যানেল আই, একাত্তর, ডিবিসি, সময় টিভি ইত্যাদি) নারী উপস্থাপকদের অনেকেই এমন এক ধারার সূচনা করেছিলেন, যা আজও নতুন প্রজন্মের উপস্থাপিকারা নকল করছেন। অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হচ্ছেন সেই চেনা মুখগুলো—আনিস আলমগীর, গোলাম মাওলা রনি, মাসুদ কামাল প্রমুখ—যাদের উপস্থিতি “নিরপেক্ষতার” মোড়কে একপক্ষীয় প্রচারণায় পরিণত হয়।

ফলত টকশোর প্রতি সাধারণের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট রয়েই যাচ্ছে। বাংলাদেশের মিডিয়া-পরিবেশ এখনো একধরনের ফ্যাসিবাদী বৃত্তে আবদ্ধ।

বাণিজ্যিকতা ও রাজনীতির যোগসাজশে টকশো হয়ে উঠেছে ভিউ-বাণিজ্যের হাতিয়ার। ‘তর্ক-বিতর্ক’, ‘চোখ রাঙানো’, ‘বাগযুদ্ধ’—এগুলো TRP বাড়ায়, কিন্তু গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৭০% দর্শক মনে করেন টকশো চ্যানেলের রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রতিফলিত করে। প্রায় অর্ধেক দর্শক বিশ্বাস করেন, উপস্থাপকরা নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।

এই বাস্তবতা থেকে বোঝা যায়, মিডিয়া এখনো মতপ্রকাশের মুক্ত মঞ্চ হয়ে উঠতে পারেনি। এ অবস্থায় টেলিভিশন টকশোকে নতুন করে ভাবতে হবে।

প্রথমত, উপস্থাপকের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তিনি বিনা ভয়ভীতিতে প্রশ্ন করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, অতিথি নির্বাচন হতে হবে বহুমাত্রিক; শুধুমাত্র দলীয় মুখ নয়, বরং তরুণ সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, নাগরিক আন্দোলনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ নাগরিককেও আলোচনায় আনতে হবে।

তৃতীয়ত, আলোচনার গঠন হবে তথ্যনির্ভর ও সমাধানমুখী। টকশোতে উত্তেজনা নয়, প্রয়োজন যুক্তির স্পষ্টতা ও পরিণামমূলক ভাবনা।

চতুর্থত, দর্শক-অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে—ফোনকল, অনলাইন প্রতিক্রিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইন্টারঅ্যাকশনকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, মিডিয়াকে মুক্ত করতে হবে রাজনৈতিক-কর্পোরেট জোটের হাত থেকে। সাংবাদিকতা যদি জনস্বার্থের পক্ষে দাঁড়াতে না পারে, তবে তা গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হারায়।

প্রায় দুই দশক ধরে টেলিভিশন টকশোর প্রযোজনা করতে গিয়ে আমি দেখেছি—এ দেশের মিডিয়া একদিকে গণআলোচনার মঞ্চ নির্মাণ করেছে, অন্যদিকে সেই মঞ্চেই শেকড় গাড়েছে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও ভয়।

এই দ্বৈততা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন সাহসী সাংবাদিকতা, নৈতিকতা এবং দর্শকের সচেতন অংশগ্রহণ।

মিডিয়া ফ্যাসিস্ট থেকে মুক্ত না হলে জনগণ কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ পাবে না। সময় এসেছে টকশোকে ভিউ-বাণিজ্যের বাইরে এনে প্রকৃত আলোচনার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার, যেখানে ভিন্নমত হবে সাহসের প্রতীক, আর সত্যের অনুসন্ধান হবে সাংবাদিকতার ধর্ম।

শামসুদ্দীন হীরা

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, কবি, লেখক ও কলামিস্ট। শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত লিখে থাকেন । ব্যপক গণসম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।

Share.
Exit mobile version