নিজস্ব প্রতিবেদক
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং রাজনৈতিক ও বৈদেশিক খাতের চাপ কমে আসায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে সংস্থাটি। তবে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি২’-তেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে মুডিস বলেছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নতুন সরকারের শক্তিশালী ম্যান্ডেট রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমিয়েছে। ফলে সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও আগের তুলনায় কমেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ দেশের বৈদেশিক অর্থায়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক অবস্থানও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে বলে জানিয়েছে মুডিস। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন, বিনিময় হার ব্যবস্থায় নমনীয়তা এবং রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ উচ্চ জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে সহায়তা করছে। জুনের শেষে আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৭২৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ রয়েছে বলে জানিয়েছে মুডিস। সংস্থাটির মূল্যায়নে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে ইতিবাচক মূল্যায়নের পাশাপাশি অর্থনীতির বড় ঝুঁকিগুলো নিয়েও সতর্ক করেছে মুডিস। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, সীমিত রাজস্ব আহরণ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
মুডিসের হিসাবে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা কাটাতে বড় অঙ্কের পুনঃমূলধনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে সরকারের আর্থিক অবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে মুডিস। সরকারের সীমিত রাজস্ব আয় এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহের অস্থিরতা ও বিদ্যুৎ খাতের কিছু দুর্বলতাকেও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ করা হয়েছিল। এবার রাজনৈতিক ও বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমে আসায় সেই পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ করা হয়েছে। মুডিস বলেছে, আগের নেতিবাচক পূর্বাভাসের পেছনে থাকা ঝুঁকিগুলো এখন তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে।
তবে ‘স্থিতিশীল’ পূর্বাভাসের অর্থ বাংলাদেশের ঋণমান উন্নীত করা হয়নি। ‘বি২’ রেটিং অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ, বৈদেশিক খাত ও অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটাতে আরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

