নিজস্ব সংবাদদাতা
যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া দ্রুত নামজারি সম্পন্ন করলে ভবিষ্যতে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও জটিলতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। তিনি বলেন, জাল দলিলের প্রবণতা বেশি থাকায় প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
আজ বুধবার (২০ মে) সকালে ভূমিসেবা মেলা-২০২৬ উপলক্ষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত “স্বয়ংক্রিয় ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা: পরিবর্তন, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা” শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, অনেক সময় ভুয়া দলিল জমা দিয়ে নামজারি করে নেওয়া হয়। পরে প্রকৃত মালিক আপত্তি জানালে সেই নামজারি বাতিল করতে হয়। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। তাই জমা দেওয়া প্রতিটি কাগজপত্র গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা জরুরি।
তিনি জানান, আগে একটি নামজারি সম্পন্ন করতে গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ দিন সময় লাগত। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে সেই সময় কমে গড়ে ১৮ দিনে নেমে এসেছে। আরও দ্রুত, নির্ভুল ও জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
মো. রায়হান কবির বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি একটি কোয়াসি-জুডিশিয়াল প্রক্রিয়া। কোনো জমি নিয়ে আপত্তি উঠলে আবেদনকারী ও আপত্তিকারী—উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নথিপত্র যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। শুধু এক পক্ষের দাবি শুনে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনা একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা গেলে দলিল, নামজারি ও রেকর্ড একসঙ্গে যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে জালিয়াতি কমবে, পাশাপাশি মানুষের ভোগান্তিও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ইতিহাস ও জটিলতার প্রসঙ্গ তুলে জেলা প্রশাসক বলেন, জমিদারি প্রথার সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন জরিপ ও রেকর্ড প্রক্রিয়ায় নানা অসঙ্গতি থেকে গেছে। কোথাও সরকারি জমি ব্যক্তি দখলে চলে গেছে, আবার কোথাও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, সিএস, এসএসহ বিভিন্ন জরিপে হাতে লেখা রেকর্ড, মানচিত্র ও বাস্তব অবস্থার অমিলের কারণে জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি জরিপেই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, যা পরবর্তীতে বিরোধের কারণ হয়েছে।
ডিসি আরও বলেন, বর্তমানে ওয়ারিশ, আদালতের রায়, দানপত্র কিংবা ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে জমির মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর নতুন জরিপ হলে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোনো রেকর্ডের পার্থক্য দেখা দেয়। কোথাও পুকুর ভরাট করে বাড়ি হয়েছে, আবার কোথাও বসতভিটা জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনাই ছিল ম্যানুয়াল। এখন কিছু সেবা অনলাইনে এলেও রেকর্ড সংশোধনের কাজ এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে হাতে সংশোধন করতে হয়। কোনো ভুল সংশোধন না হলে সেটি পরবর্তী রেকর্ডেও বহাল থাকে।
ভূমি বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবের কথাও উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, অনেকেই ওয়ারিশ সূত্রে জমির মালিক হলেও সময়মতো নামজারি বা রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নেন না। এ বিষয়ে নাগরিকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নাঈমা ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাসমিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলীনূর খান, সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজমুল হুদা, সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবযানী কর এবং ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


