আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের রাজনীতি এখন এক অস্বাভাবিক পরিবর্তনের চক্রে ঘুরবাক খাচ্ছে। একসময় যেখানে প্রধানমন্ত্রীরা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে স্থিতিশীল নেতৃত্ব দিতেন, এখন ঘন ঘন নেতৃত্ব বদলের ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্থিরতা শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সমস্যার ফল।

অর্থনৈতিক সংকট, ব্রেক্সিটের প্রভাব, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক বিভাজন—সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের শাসনব্যবস্থা জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় আধিপত্য ভেঙে বহু দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করেছে।

ব্রিটিশ লেখক ও জীবনীকার অ্যান্টনি সেলডনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নব্বইয়ের দশকের তুলনায় এখন প্রধানমন্ত্রীদের সময়কাল অনেক ছোট হয়ে গেছে। আগে যেখানে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে একজন নেতা দীর্ঘ সময় থাকতেন, এখন সেখানে কয়েক বছরের মধ্যেই বারবার নেতৃত্ব বদল দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তনের গতি এত বেশি যে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

সেলডন মনে করেন, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে যুক্তরাজ্যের প্রকৃত মজুরি ও উৎপাদনশীলতা প্রায় স্থবির হয়ে আছে। ব্রেক্সিটের কারণে মাথাপিছু জিডিপি কমেছে, বেড়েছে ঋণের চাপ। একই সঙ্গে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ঋণের সুদহার ও জ্বালানি ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ হলো নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতা। ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যকর থাকলেও বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, গ্রিন পার্টি, রিফর্ম ইউকে এবং স্কটিশ ও ওয়েলশ জাতীয়তাবাদী দলগুলোর উত্থানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বহু-মুখী হয়ে উঠেছে।

এর ফলে সরকার গঠন ও স্থিতিশীলভাবে শাসন পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নকে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে, যার ফলেই নেতৃত্ব ঘন ঘন পরিবর্তিত হচ্ছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ক্ষেত্রেও একই চাপ স্পষ্ট। স্থানীয় নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও তার সরকার স্বাস্থ্যসেবা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কিছু অগ্রগতি দেখাতে চাইছে, তবুও রাজনৈতিক আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সেলডনের মতে, যুক্তরাজ্য শাসন-অযোগ্য নয়, বরং দক্ষ নেতৃত্ব ও স্পষ্ট রাজনৈতিক গল্পের অভাবেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী যদি জনগণের সামনে পরিষ্কার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে ব্যর্থ হন, তবে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

Share.
Exit mobile version