ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশের বোলাররা যখন স্কোরবোর্ডে ২ ওভার শেষে ৩ উইকেট ঝুলিয়ে দিলেন, তখনও অস্ট্রেলিয়ার রান শূন্য। স্কোরলাইনটা দেখে চোখ কচলানোরই কথা। কারণ প্রতিপক্ষ যে ক্রিকেট পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া।
ওয়ানডে ইতিহাসে ১,০২৪ ম্যাচ খেলার পর এই প্রথম শূন্য রানে ৩ উইকেট হারাল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর আজ (বৃহস্পতিবার, ১১ জুন) ম্যাচ শেষে আরও একটি প্রথমের সাক্ষী হলো তারা। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হারল অস্ট্রেলিয়া।
মিরপুরে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশ জিতেছে ৫ উইকেটে। বৃষ্টি আইনে ৪১ ওভারে ১৯২ রানের লক্ষ্য ৬ বল বাকি থাকতেই টপকে যায় স্বাগতিকরা। তিন ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে সিরিজও নিশ্চিত করে ফেলে বাংলাদেশ।
এই জয় শুধু একটি সিরিজ জয় নয়। বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের আরেকটি মাইলফলক। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে এতদিন শুধু ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জেতা হয়নি বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়ার নামটাও মুছে গেল সেই তালিকা থেকে। এখন বাকি শুধু ইংল্যান্ড।
ম্যাচের শুরুতেই ম্যাথু শর্ট যেন টাটকা দুঃস্বপ্নটা আবার দেখলেন। প্রথম ওয়ানডেতে তাসকিন আহমেদের বলে বোল্ড হয়েছিলেন। এবার বোল্ড হলেন আরও নাটকীয়ভাবে, বলটি ছেড়ে দিতে গিয়ে দেখলেন স্টাম্প ছিটকে গেছে।
পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের প্রথম বলে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দেন কুপার কনোলি। ওয়ানডে ইতিহাসে মাত্র তৃতীয়বারের মতো দুই ওপেনারই ডাক মেরে ফিরলেন অস্ট্রেলিয়ার। এই ওভারের শেষ বলে একই পরিণতি ম্যাট রেনশর।
স্কোরবোর্ডে তখন অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য—অস্ট্রেলিয়া ০/৩।
ভয়াবহ ধাক্কা সামলানোর দায়িত্ব নেন জস ইংলিস। অ্যালেক্স ক্যারির সঙ্গে ২৫ এবং ক্যামেরন গ্রিনের সঙ্গে ৩৮ রানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন ইংলিস। কিন্তু তানভীর ইসলামের স্পিনে ভেঙে যায় সেই প্রতিরোধ। ৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে আবারও খাদে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
সেখান থেকে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন ক্যামেরন গ্রিন ও মার্নাস লাবুশেন। দুজন মিলে গড়েন ১১৫ বলে ১০৩ রানের মূল্যবান জুটি। একসময় মনে হচ্ছিল, শুরুর ধাক্কা সামলে সম্মানজনক সংগ্রহের দিকেই এগোচ্ছে সফরকারীরা।
কিন্তু আবার হাজির তাসকিন। পরপর দুই বলে বোল্ড করেন গ্রিন ও অ্যাডাম জাম্পাকে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আবার পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে চলে আসে।
এরপর বৃষ্টি নামলে ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রানে থামে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২ রান।
লক্ষ্য তাড়ায় শুরুটা অবশ্য বাংলাদেশেরও ভালো হয়নি। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই ফিরে যান তানজিদ হাসান। অস্ট্রেলিয়া এরপর আরও কিছু সুযোগ তৈরি করেছিল। জেভিয়ার বার্টলেট নিজের বলে নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচ ফেলেন। পরের বলেই এলবিডব্লুর সিদ্ধান্ত আসে, কিন্তু রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান বাংলাদেশ অধিনায়ক।
সেখান থেকেই ম্যাচের গল্প বদলাতে শুরু করে। শান্ত ও সৌম্য সরকার ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ নেন। কখনও ড্রাইভ, কখনও পুল, কখনও কভার দিয়ে চোখজুড়ানো শট। দুজনের ব্যাটে চাপ কমতে থাকে বাংলাদেশের।
তাঁদের ৯৩ বলে ৮৬ রানের জুটিই জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়। দুজনই অবশ্য ৪২ রান করে আউট হন। ফিফটির আক্ষেপ নিয়েই ফিরতে হয়।
এরপর কিছুটা দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ফেরার সুযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজ গড়েন ৪৮ বলে অপরাজিত ৫১ রানের জুটি। হৃদয় খেলেন ৪০ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস। মিরাজ করেন ২২ রান।
ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই একবার মাথায় বল লেগে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল মিরাজকে নিয়ে। কিন্তু তিনি মাঠ ছাড়েননি। বরং শেষটা করেছেন নিজের মতো করেই।
একটি ছক্কা। আর সেই ছক্কাতেই নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সিরিজ জয়।
মিরপুর তখন উৎসবে মেতেছে। কারণ, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আরেকটি অপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে সেদিন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়। এবং সেটিও এসেছে দাপটের সঙ্গে।

