নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, গবেষণা, কৃষি পরামর্শসেবা, সেচ, বাজার সংযোগ এবং জলবায়ু সহনশীলতায় বেশি বিনিয়োগ করা জরুরি। তাদের মতে, লক্ষ্যভিত্তিক ও দক্ষ ব্যয় কৌশল গ্রহণ করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

সোমবার (১৫ জুন) প্রকাশিত “রিপারপোজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স অ্যাগ্রিফুড সিস্টেম” শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ কৃষি খাতে ব্যয় করে, যা খাতটির প্রতি সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকারকে নির্দেশ করে। তবে চিত্রটি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে এবং উৎপাদনশীলতার অগ্রগতিও কমে এসেছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফসলের বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সীমিত।

এর একটি বড় কারণ ব্যয়ের কাঠামো। বর্তমানে কৃষি খাতে ব্যয়ের বড় অংশ ভর্তুকি ও ধাননির্ভর সহায়তায় সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পিছিয়ে আছে; কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ সেবা, সেচ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম।

বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই সার ভর্তুকিতে ব্যয় হয়। এই ভর্তুকি উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করলেও কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। ভর্তুকি সরাসরি সার কেনার পরিমাণের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বড় জমির মালিকরাই বেশি সুবিধা পান। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ২০ শতাংশ ভূমিমালিক মোট সার ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পান। অন্যদিকে ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক পান মাত্র ১৫ শতাংশ সুবিধা।

সারের ব্যবহারে তীব্র ভারসাম্যহীনতার মতোই মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রায় সুষম পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করতে পারেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাটির উর্বরতায়, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে সীমিত করছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জিন পেসমি বলেন, কৃষি বাংলাদেশের উন্নয়নের কেন্দ্র। এটি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং সার সরবরাহ ও মূল্যের ওঠানামা নতুন চাপ তৈরি করছে। এগুলো বিদ্যমান নীতি ও ব্যয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে।

তিনি আরও বলেন, সহায়তা বা ভর্তুকি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন দরকার। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ধাপে ধাপে উচ্চ ফলনশীল খাতে সরাতে হবে। এটি করা গেলে একটি শক্তিশালী কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভালো মানের কর্মসংস্থান তৈরি করবে।

প্রতিবেদনে কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার ধীরগতির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭২ শতাংশ আবাদযোগ্য জমিতে ধান চাষ হয় এবং ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশই এই খাতেই কেন্দ্রীভূত। প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, শাকসবজি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্ভাবনা বেশি হলেও এই খাতগুলো এখনও বিনিয়োগের দিক থেকে পিছিয়ে আছে।

সংস্থাটি ধাপে ধাপে নীতি সংস্কারের সুপারিশ করেছে। স্বল্পমেয়াদে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা বাড়ানো এবং কৃষি পরামর্শসেবা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে কৃষক কার্ড ও ই-ভাউচার ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত সহায়তার টাকা লক্ষ্যভিত্তিকভাবে দরিদ্র কৃষকদের কাছে পৌঁছায়। দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে সাশ্রয় হওয়া অর্থ উৎপাদনশীলতা এবং উচ্চমূল্যের কৃষিখাতে পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।

প্রতিবেদনের সহলেখক এবং বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মনসুর আহমেদ বলেন, সার ভর্তুকির কাঠামো আধুনিক করা জরুরি। এটি করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে, পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়বে ও মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এর ফলে প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

Share.
Exit mobile version