দেশের অর্থনীতিতে ধীরগতির স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। শিল্প খাত প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে যাওয়ায় সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সেবাখাতের মন্থর গতির প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রে।
সোমবার (২০ জুলাই) প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ত্রৈমাসিক (জানুয়ারি-মার্চ) জিডিপি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২ দশমিক ২২ শতাংশে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রবৃদ্ধির গতি ধারাবাহিকভাবে কমছে। প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সংশোধিত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তা কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। আর তৃতীয় প্রান্তিকে আরও কমে ২ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে। ফলে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন প্রান্তিক মিলিয়ে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে শিল্প খাতে। প্রথম প্রান্তিকে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে ১ দশমিক ২৭ শতাংশে নেমে আসে। আর তৃতীয় প্রান্তিকে প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে শিল্প খাত। এক বছর আগে একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
শুধু শিল্প নয়, কৃষি ও সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমেছে।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে চলতি মূল্যে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। অর্থনীতির আকার বাড়লেও উৎপাদনের গতি কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী হয়েছে।
সাময়িক প্রাক্কলনে বিবিএস জানিয়েছে, পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস আরও কম। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে ধারণা দিয়েছে।
এডিবির মতে, দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চ ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
সর্বশেষ ত্রৈমাসিকের এই চিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রবৃদ্ধির গতি ফেরাতে শিল্প খাতকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করাই হতে পারে অর্থনীতির গতি ফেরানোর প্রধান উপায়।

