শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি খাতে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাটিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে সরবরাহ ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তার কারণে মার্চ মাসজুড়ে দেশীয় বাজারে তেলের বড় ধরনের ঘাটতি থাকলেও এপ্রিল থেকে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে যে বর্তমানে আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল সরসরাহের ক্ষেত্রে তেমন সংকটের আশঙ্কা নেই। মূলত বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ এবং নিয়মিত এলসি খোলার মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখায় বাজার এখন স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে।

বিপিসির মাসিক আমদানির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে সমুদ্রপথে ১০টি জাহাজ ও ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৩ লাখ ২২৩ টন জ্বালানি তেল দেশে এসেছিল। যুদ্ধের কারণে সেই সময় নির্ধারিত সূচির বেশ কয়েকটি জাহাজ পিছিয়ে যাওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে এপ্রিল মাসে পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি ঘটে এবং ১৮টি জাহাজে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন তেল আমদানি করা হয়। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২৫ হাজার টন ডিজেল। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তেলের ঘাটতি দ্রুত দূর করা সম্ভব হয়েছে। সরবরাহের এই ইতিবাচক ধারা মে মাসেও অব্যাহত রাখতে চায় সরকার।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী চলতি মে মাসে ১৯টি জাহাজে প্রায় ৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আসবে।  এর মধ্য প্রথম ১০ দিনেই ৯টি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। সর্বশেষ ‘এমটি টর্ম দুর্গা’ নামের একটি জাহাজে ওমান থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেল খালাস করা হয়েছে।

আমদানির এই গতিশীলতার কারণে গত ১৯ এপ্রিল থেকে সরকার অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং ডিজেল ও পেট্রলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে আগের মতো দীর্ঘ লাইন  এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

সরবরাহ স্বাভাবিক করার আগে গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন যে নিয়মিত উৎসের পাশাপাশি বিকল্প দেশ থেকেও তেল আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

বর্তমানে দেশে ডিজেলের যে মজুত রয়েছে তা দিয়ে ২১ দিন এবং অকটেনের মজুত দিয়ে ৪০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের মজুতও পর্যাপ্ত থাকায় স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি সংকটের কোনো ঝুঁকি নেই বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোরও পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ে। এই প্রবণতা বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। তাই স্থায়ী স্বস্তি ফেরাতে হলে ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানিকাঠামোয় বৈচিত্র্য আনা জরুরি।

বিপিসি কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মে মাসের বাকি চালানগুলো দেশে পৌঁছালে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি তেলের বাজার আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।

Share.
Exit mobile version