মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এক অপ্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছেন। শনিবার তিনি তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social) প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা দেন, নাইজেরিয়া যদি “খ্রিষ্টান হত্যার” বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র “গানস-অ্যা-ব্লেজিং” পদ্ধতিতে সামরিক হামলা চালাবে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে নাইজেরিয়ার জন্য নির্ধারিত সব সহায়তা ও অনুদান বন্ধ করবে।

এই বক্তব্য ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ নাটকীয় রাজনীতির অংশ হলেও, এতে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতি এমন প্রকাশ্য সামরিক হুমকি শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের নীতিকেও চ্যালেঞ্জ করে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “আমাদের প্রিয় খ্রিষ্টানদের উপর হামলা হলে আমরা আঘাত করব দ্রুত, নির্মম ও মিষ্টি।” এই ভাষা রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ, কারণ এতে সামরিক পদক্ষেপকে ধর্মীয় প্রতিশোধের রূপ দেওয়া হয়েছে।

২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তাঁর শাসনামলে ট্রাম্প নিজেকে “খ্রিষ্টান বিশ্বের রক্ষাকর্তা” হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। ২০২৫ সালের মার্কিন নির্বাচনে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে তিনি আবার সেই পুরোনো আবেগকে উসকে দিচ্ছেন।

এই কৌশল নতুন নয়। মার্কিন রাজনীতিতে “ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার খ্রিষ্টানদের রক্ষার” বিষয়টি রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে সবসময়ই জনপ্রিয়। নাইজেরিয়ার প্রসঙ্গটি ট্রাম্প সেই আবেগ কাজে লাগানোর সর্বশেষ প্রচেষ্টা।

নাইজেরিয়া আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ধর্মীয়ভাবে জটিল সমাজ। দেশটিতে ইসলাম, খ্রিষ্টান ধর্ম ও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস মিলিয়ে সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে উত্তরাঞ্চলে বোকো হারাম ও আইএস-সংশ্লিষ্ট চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সন্ত্রাস দীর্ঘদিন ধরেই চলেছে।

এই সহিংসতার শিকার শুধু খ্রিষ্টানরাই নন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যে দেখা যায়, বোকো হারামের হাতে নিহতদের বড় অংশই মুসলমান। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। এটি একতরফা ধর্মীয় বয়ান, যা আফ্রিকার জটিল সামাজিক কাঠামোকে রাজনৈতিক প্রচারের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে।

নাইজেরিয়াকে লক্ষ্য করে ট্রাম্পের বক্তব্যের পেছনে আরেকটি বাস্তবতা কাজ করছে। আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ক্রমশ কমছে। চীন ও রাশিয়া সেখানে নতুন বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
ট্রাম্পের হুমকি সেই প্রেক্ষাপটে এক ধরনের কৌশলগত বার্তা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, আমেরিকা এখনো সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা রাখে এবং প্রয়োজনে আফ্রিকায় “আবার ফিরতে” পারে। তবে এই ধরনের বক্তব্য আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ট্রাম্পের “গানস-অ্যা-ব্লেজিং” মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি সবসময়ই কূটনীতি, জোট, এবং মানবাধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এক ধর্মীয় গোষ্ঠীকে রক্ষার নামে সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা সেই ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এ ধরনের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে একপাক্ষিক, আগ্রাসী ও রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে এটি আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করবে।

নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু ইতিমধ্যে ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে বলেছেন, নাইজেরিয়া ধর্মীয়ভাবে সহিষ্ণু রাষ্ট্র এবং সরকার সব নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে কোনো বিদেশি হুমকিকে মেনে নেওয়া হবে না।

এই প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, আফ্রিকার দেশগুলো আর আগের মতো পশ্চিমা নির্দেশনাকে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি ধর্মীয় আবেগ, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত নির্বাচনী কৌশলের এক জটিল মিশ্রণ। এতে মানবাধিকার নয়, বরং মার্কিন ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অভ্যন্তরীণ ভোট রাজনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাইজেরিয়ার মতো বহুধর্মীয় ও বহুজাতিক সমাজে এই ধরনের আগ্রাসী বক্তব্য শুধু সহিংসতা উস্কে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তরিক হয়, তবে কূটনৈতিক সংলাপ, সহায়তা ও শিক্ষামূলক সহযোগিতার পথেই সমাধান খুঁজতে হবে।

অন্যথায়, “গানস-অ্যা-ব্লেজিং” ধরনের হুমকি শুধু নাইজেরিয়া নয়, পুরো আফ্রিকা মহাদেশকেই নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

আজমান রাশেদ খন্দকার

সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক। p>

Share.
Exit mobile version