শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক এক বিশাল মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকের সভায়  ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন মেয়াদে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করবে। একনেক সভা শেষে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী এই প্রকল্পকে জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বর্ণনা করে জানান যে এর ফলে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকার প্রায় ৭ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।

খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলাকে কেন্দ্র করে নেওয়া এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি ও বড়ালসহ প্রধান নদীগুলোর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গঙ্গা ও পদ্মা নদীনির্ভর এই বিশাল জনপদে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমিয়ে আনাই হবে এই ব্যারাজের অন্যতম প্রধান কাজ।

এছাড়া সুন্দরবনের জন্য প্রয়োজনীয় মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং যশোরের ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন ও ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর সুরক্ষায় এই প্রকল্প যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। কৃষি সেচ সুবিধা প্রসারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর আবাদি জমিকে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

প্রকল্পের কারিগরি কাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায় যে পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে যেখানে ৭৮টি স্পিলওয়ে এবং ১৮টি আন্ডারস্লুইস থাকবে। নৌ-চলাচল সচল রাখতে নৌ-লক এবং মাছের অবাধ বিচরণের জন্য দুটি ফিশ পাস নির্মাণের পাশাপাশি গড়াই ও মধুমতি নদী ব্যবস্থায় ১৩৫ কিলোমিটারেরও বেশি ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি এই প্রকল্পের আওতায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে যা জাতীয় গ্রিডে ক্লিন এনার্জি যুক্ত করবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের জিডিপিতে প্রায় ০.৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে এবং প্রতি বছর জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা যোগ হবে।

প্রকল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে ১৯৭০-এর দশকে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে পদ্মা-গঙ্গার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের এক বিশাল এলাকা মরুকরণ ও লবণাক্ততার কবলে পড়েছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিঠাপানির প্রবাহ সংকুচিত হওয়ায় কৃষি, মৎস্য ও বনজ সম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলো।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, পাবনা ও বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ৩৭ শতাংশ ভূখণ্ডের মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে এই ব্যারাজ এখন সময়ের দাবি। সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পদ্মা নদীতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে যা সামগ্রিক পরিবেশ ও কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসবে।

Share.
Exit mobile version