নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো, সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শুক্রবার (১২ জুন) ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কোনো স্বল্পমেয়াদি সমস্যা নয়; বৈশ্বিক সংঘাত, আমদানির উচ্চ ব্যয়, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং কয়েক বছরের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক চাপের ফল এটি।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, গত তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ঋণখেলাপি, জালিয়াতি ও অর্থপাচারের কারণে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা তহবিলের ব্যয় বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজারের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তবে ব্যবসা সহজীকরণ, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো, বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ব্যয় কমানো সম্ভব।
বাজারে নজরদারি বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঠিক নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি ঋণ গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো হবে। কারণ অতিরিক্ত সরকারি ঋণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে পরিকল্পিত ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমানো হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিম্নআয় ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক সহায়তা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে নতুন বাজেটের অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, কারুশিল্পী, তাঁতি, কুমার, সংগীতশিল্পী ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবীদের মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে ৮০০ কোটি টাকার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, ডিজাইন সহায়তা ও বাজারসুবিধা দেওয়া হবে।
অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ সীমিত করতে জমির পুরোনো মৌজা মূল্য পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি তদারকির জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স এবং একটি অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হবে। বাস্তবায়নে বিলম্ব বা অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রণীত এ বাজেটের লক্ষ্য অর্থনৈতিক সুযোগকে সমাজের সব স্তরে পৌঁছে দেওয়া। ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্প মূল্যায়নে অর্থের যথাযথ ব্যবহার, বিনিয়োগের প্রতিফলন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত টেকসইতাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

