আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান তৎপরতার মধ্যে অঞ্চলটির নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং যোগাযোগ অবকাঠামোতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় ২৭ দেশের এই জোট।
বার্তা সংস্থা এএফপির হাতে আসা ইইউর নতুন আর্কটিক কৌশলের খসড়া অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, বরফভাঙা জাহাজ এবং সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবলের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ ও উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে আর্কটিক অঞ্চল।
ইইউর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ববিষয়ক প্রধান জোজেফ সিকেলা বলেন, আর্কটিকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইউরোপকে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। নতুন কৌশলে জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ায় অঞ্চলটিতে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও নতুন সমুদ্রপথ ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিজেদের তৎপরতা জোরদার করছে। ফলে অঞ্চলটির সম্পদ ও কৌশলগত পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।
ইইউর ২৭ সদস্যের মধ্যে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন আর্কটিক অঞ্চলের দেশ। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের বক্তব্য ইউরোপের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আর্কটিকে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব উত্তরাঞ্চলের বাইরেও পড়তে পারে বলে মনে করছে জোটটি।
নতুন কৌশলে কানাডা, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের মতো ইইউর বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খসড়ায় উত্তরাঞ্চলীয় অংশীদারদের নিয়ে নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাবও রয়েছে। এর মাধ্যমে আর্কটিক নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন নীতিগত অবস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ
খসড়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য অংশীদারদের তালিকায় রাখা হলেও দেশটির উল্লেখ তুলনামূলকভাবে সীমিত। নথিতে কানাডার সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে আর্কটিক অঞ্চলে যোগাযোগ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ইঙ্গিত রয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপনে একটি নিরাপদ সাবমেরিন কেবল বসানোর প্রস্তাব রয়েছে। বৃহত্তর প্যান-আর্কটিক কেবল প্রকল্পের মাধ্যমে কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ধরনের অবকাঠামো আঞ্চলিক যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া ‘আইরিস’ নামের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক প্রকল্পের মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে ইইউ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়বে এবং বেসরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাশিয়ার তৎপরতা মোকাবিলাও নতুন কৌশলের অন্যতম অগ্রাধিকার। খসড়ায় ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবলে সম্ভাব্য নাশকতার মতো নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হুমকি শনাক্ত ও মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত রাশিয়ার কথিত ‘ছায়া নৌবহর’-এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানো এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রচেষ্টা শক্তিশালী করতে চায় জোটটি।
নতুন কৌশলটির লক্ষ্য আর্কটিক অঞ্চলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা, নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো। তবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলোর সমন্বয়, বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর।

