আকীল আকতাব
জার্মানির স্টুটগার্ট আর্ট মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝুলে আছে ‘গ্রসস্টাড’ (Großstadt) বা মহানগর। ‘মহানগর’ সাধারণ শিল্পকর্ম নয়। ওটো ডিক্সের ১৯২৭ সালে আঁকা ‘মহানগর’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্রের এক ধ্রুপদী দলিল। এই চিত্রকর্মটি এমন এক সময়কে ধারণ করে, যখন দেশটির সংস্কৃতি ছিল শিখরে। কিন্তু সেই উজ্জ্বলতার আড়ালেই জমা হচ্ছিল গভীর সংকট, যা শেষ পর্যন্ত জার্মানিকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।
ওটো ডিক্স প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি যে সময়ে এই ছবিটি আঁকেন, তখন একদিকে জার্মানি মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে অন্যদিকে সামাজিক অস্থিরতা তীব্র। সেই নিরেট বাস্তবতা ধারণ করেছে মহানগর।
‘মহানগর’ তিনটি প্যানেলে বিভক্ত। এর বিন্যাস প্রাচীন গির্জার অল্টারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ জাগতিক এবং অস্বস্তিকর বাস্তবতায় পরিপূর্ণ। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির জীবনকে পাশাপাশি তুলে ধরতে এই কাঠামো ব্যবহার করেছেন ।
বাম দিকের প্যানেলে দেখা যায়, যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে ফিরে আসা এক সৈনিক এক রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর শরীরে আঘাতের দাগ স্পষ্ট। অথচ চারপাশের শহর আপন ছন্দে মুখর। কেউ তাঁর দিকে তাকাচ্ছে না। তিনি যেন থেকেও সমাজের চোখে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য দেখা যায় মাঝখানের বড় প্যানেলে। সেখানে ১৯২০-এর দশকের বার্লিনের এক নৈশক্লাব। ঝলমলে পোশাকের নারী ও পুরুষরা নাচছে, জ্যাজ সংগীতের মূর্ছনায় ডুবে আছে। প্রথম দৃষ্টিতে দৃশ্যটি প্রাণবন্ত মনে হলেও, চেহারাগুলোতে ভিন্ন বাস্তবতা স্পষ্ট। আনন্দের চেয়ে বেশি শূন্যতা, ক্লান্তি এবং অন্তর্গত বিচ্ছিন্নতা।
এই বৈপরীত্যই ডিক্সের শিল্পের মূল শক্তি। তিনি ‘নিউ অবজেক্টিভিটি’ (Neue Sachlichkeit) বা নতুন বস্তুনিষ্ঠতা ধারার চরম রূপ তুলে ধরেছেন। কোনো কিছুকে নাটকীয় বা অতিরঞ্জিত করার পরিবর্তে তৎকালীন জার্মানির বাস্তবতাকে নির্মমভাবে উপস্থাপন করেছেন। একদিকে ধনী শিল্পপতিরা শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন, অন্যদিকে পাশেই একদল মানুষ দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত। মহানগরে এই তীব্র বৈষম্যই জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
চিত্রকর্মের ডান দিকের প্যানেল সামাজিক সংকটকে গভীরতর করে তোলে। সেখানে উপস্থিত অন্ধকার গলিতে অপেক্ষারত নারীরা, যারা অর্থের বিনিময়ে দেহ বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছে। ডিক্স দেখিয়েছেন, কোনো সমাজ যখন নৈতিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে, সেই অবক্ষয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই অনেক শিল্পসমালোচক এই চিত্রকর্মকে জার্মানির আসন্ন পরিণতির রূপক হিসেবে দেখেন।
১৯২৭ সালে ডিক্স এই ছবিটি আঁকছিলেন, তখন জার্মানিতে গণতন্ত্র ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ছিল, সামাজিক অস্থিরতাও ছিল প্রকট। তিনি সেই লক্ষণগুলো গভীরভাবে অনুভর করতে পেরেছিলেন। ফলে প্রায় এক শতাব্দী পরও ‘মহানগন’-এর ভবিষ্যদ্বাণীমূলক শক্তি বিস্মিত করে। বার্লিনের সেই নাচ, সেই আলোকোজ্জ্বল জীবন আর আড়ালে থাকা হাহাকার যেন সতর্ক করে দিচ্ছিল যে, গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জার্মানি।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। একটি চিত্রকর্ম কি সত্যিই একটি জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইঙ্গিত দিতে পারে? বিষয়টি অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরবোধ সম্পন্ন শিল্পীরা প্রায়ই সমাজের এমনসহ স্পন্দন অনুভব করেন, যা সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়। ওটো ডিক্সও তেমনই একজন শিল্পী ।
তাঁর তুলির আঁচড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, জার্মানির সংকট কেবল অর্থনৈতিক ছিল না। সঙ্গে জড়িত ছিল নৈতিক ও চারিত্রিক অবক্ষয়। মূল্যবোধের পতন কীভাবে একটি সমাজকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে, তা তিনি অসাধারণ শক্তির সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
কয়েক বছর পর সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেয়। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় আসেন। জার্মানি সম্পূর্ণভাবে একনায়কতন্ত্রের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। সে সময় ওটো ডিক্সের মতো শিল্পীদের কাজকে ‘ডিজেনারেট আর্ট’ বা ‘ভ্রষ্ট শিল্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কারণ, তাঁর শিল্পকর্ম মানুষকে এমন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল, যা নাৎসিরা সহ্য করতে পারেনি।
এই কারণেই ‘মহানগর’ কেবল ১৯২৭ সালের বার্লিনের গল্প নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা, যা সময় ও ভূগোলের সীমা অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক। যখনই কোনো সমাজ তার বিবেক হারিয়ে ভোগবাদে মত্ত হয়, তখনই অবক্ষয়ের লক্ষণ দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ওটো ডিক্স তাঁর তুলিতে সেই লক্ষণগুলো ধরে রেখেছেন। এই চিত্রকর্ম আজও মনে করিয়ে দেয়, কোনো পতনই আকস্মিক নয় পতনের পূর্বাভাস, অনেক আগেই সমাজের ভেতরে জন্ম নিতে শুরু করে।

