আকীল আকতাব
বিশ্ব সাহিত্যে সবসময়ই পশ্চিমা দুনিয়ার একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। তবে লাতিন আমেরিকার ‘ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম’ আর জাপানি সাহিত্যের ‘মেলাঙ্কোলিয়া’ পশ্চিমা পাঠকদের মুগ্ধ করেছে। কিন্তু সমসাময়িক চীনা সাহিত্য ছিল প্রায় অপরিচিত। চলতি বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বেইজিংয়ের প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক ঝাং ইউয়েরান (Zhang Yueran)। তিনি শুনিয়েছেন আশার কথা, এই অচলায়তন ভাঙতে শুরু করেছে। পশ্চিমা পাঠকেরা এখন চীনা লেখকদের গল্প ও চিন্তাভাবনাকে আপন করে নিচ্ছেন।
ঝাং ইউয়েরান চীনের ‘আশি দশকের পরবর্তী’ (১৯৮০-এর দশকে জন্ম নেওয়া) প্রজন্মের লেখকদের অন্যতম প্রতিনিধি। এই প্রজন্ম চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং তীব্র সামাজিক পরিবর্তনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সম্প্রতি তাঁর নতুন উপন্যাস ‘উইমেন, সিটেড’ (Women, Seated)-এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে। বইটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় রূপান্তর করেছেন খ্যাতনামা অনুবাদক জেরেমি তিয়াং (Jeremy Tiang)। বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগানো এই উপন্যাস, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনা সাহিত্য নিয়ে আলোচনাকেও বেগবান করেছে।
ঝাং ইউয়েরানের নতুন উপন্যাস ‘উইমেন, সিটেড’ মূলত বেইজিংয়ের উচ্চবিত্ত বা এলিট শ্রেণির পারিবারিক অন্দরমহলের গল্প। এর কেন্দ্রে রয়েছেন একজন গৃহপরিচারিকা বা ন্যানি। তিনি একটি অতি ধনী চীনা পরিবারের একমাত্র সন্তানের যত্ন নেন। তিনি শুধু পরিচর্যাকারী নন, বরং হয়ে ওঠেন পরিবারের অন্ধকারতম গোপন রহস্যের নীরব সাক্ষী। এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। যে ধনী মালিকেরা এতদিন নিয়ন্ত্রক ছিলেন, তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। আড়ালে থাকা গৃহপরিচারিকাই হয়ে ওঠেন ঘটনাপ্রবাহের মূল চালিকাশক্তি।
উপন্যাসটিতে নারীর অবস্থানও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ঝাং ইউয়েরান বলেন, তাঁর উপন্যাসের নারীরা যেন একেকটি গ্রহ, যারা পুরুষ নামক সূর্যের চারপাশে আবর্তিত হচ্ছে। তবে তারা নিষ্ক্রিয় বা দুর্বল নয়; বরং এই সীমাবদ্ধ কক্ষপথের ভেতরেই নিজেদের অস্তিত্ব, নৈতিকতা এবং মানবিকতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হন।
পশ্চিমা পাঠকদের এই আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে সমসাময়িক চীনের নারীদের সত্য ও স্পষ্ট কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমনটাই মনে করেন ঝাং ইউয়েরান। আগে পশ্চিমা বাজারে চীনা সাহিত্য বলতে মূলত প্রাচীন ইতিহাস, রাজনৈতিক সংঘাত, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক বিপ্লব, কিংবা কমিউনিস্ট শাসনের অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক গল্পকে বোঝানো হতো। ফলে পশ্চিমা পাঠকেরা দীর্ঘদিন চীনকে একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবেই দেখেছেন।
বর্তমান প্রজন্মের লেখিকারা সেই গণ্ডি ভেঙে দিয়েছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, আজকের চীন শুধু রাজনীতির গল্প নয়; এটি তীব্র প্রতিযোগিতা, আবাসন সংকট, লৈঙ্গিক বৈষম্য এবং কর্পোরেট জীবনের ক্লান্তিরও গল্প। ঝাং-এর ভাষায়, “বৈশ্বিক সাহিত্য অঙ্গনে চীনা নারীদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি এক দারুণ সুযোগ ও পরিবর্তনের সময়। পশ্চিমা পাঠকেরা কেবল চীনের রাজনৈতিক কাঠামো দেখতে চান না, তাঁরা জানতে চান আজকের চীনের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা কীভাবে ভাবছেন, কীভাবে সমাজ ও সংস্কৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিদিন লড়াই করছেন।”
এই পরিবর্তনের পেছনে অনুবাদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংস্কৃতিকে অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম অনুবাদ। ঝাং ইউয়েরান তাঁর সাক্ষাৎকারে অনুবাদের সূক্ষ্মতা ও চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোকপাত করেন।
এ প্রসঙ্গে তাঁর আগের সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘ককুন’ (Cocoon)-এর কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। উপন্যাসটি ইউরোপের একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। প্রখ্যাত লেখক ইয়ান ম্যাকইউয়ান (Ian McEwan) ও জুনোট ডিয়াজ (Junot Díaz)-এর প্রশংসাও অর্জন করেছিল।
ঝাং মনে করেন জেরেমি তিয়াং-এর মতো দক্ষ অনুবাদকেরা শুধু শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করেন না, তাঁরা সংস্কৃতির ভাবার্থও অনুবাদ করেন। চীনের সমাজব্যবস্থায় এমন অনেক উপাদান রয়েছে, যেমন শ্রেণিভেদ, পারিবারিক গোপনীয়তা কিংবা প্রাচ্য রূপকের জটিলতা, যা সরাসরি পশ্চিমা ভাষায় বোঝানো কঠিন। তবে নতুন প্রজন্মের অনুবাদকদের কারণে এই ভাষাগত দূরত্ব কমে আসছে। পশ্চিমা পাঠকদের কাছে চীনা গল্পগুলোকে আরও সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
ঝাং কিছু অভ্যন্তরীণ সংকটের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, চীনের সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় রক্ষণশীল। নারীদের নিজস্ব ক্যারিয়ার গড়া বা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা প্রায়ই সামাজিক চাপের মুখে পড়ে।
এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাসের তুলনায় ডিজিটাল বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং শর্ট ভিডিওর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বয়স্ক পাঠকদের বড় একটি অংশ ধ্রুপদী ও ঐতিহাসিক উপন্যাসে বেশি মনোযোগী। ফলে সমসাময়িক ও তরুণ লেখকদের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতাই আবার নতুন লেখকদের সৃজনশীলতার উৎস হয়ে উঠছে। সামাজিক চাপ, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং শ্রেণিবৈষম্যের শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা তাঁদের লেখার প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছে। এসব মানবিক গল্প, যা একই সঙ্গে স্থানীয় ও সর্বজনীন, পশ্চিমা পাঠকদের হৃদয়েও জায়গা করে নিচ্ছে। ভৌগোলিক দূরত্ব বা শাসনব্যবস্থার পার্থক্য থাকলেও মানুষের মৌলিক আবেগ, হতাশা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সর্বত্র একই রকম।
সাহিত্য কখনো সীমানা মানে না। যখন একটি গল্পে মানুষের সত্যিকারের সুখ-দুঃখ ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে, তখন তা বেইজিংয়ের কোনো অন্দরমহলের গল্প হলেও নিউ ইয়র্ক বা লন্ডনের পাঠকদেরও নিজের গল্প হয়ে ওঠে।


