আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ অবসানে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ । চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য জানান।
শেহবাজ শরিফের ঘোষণার পর চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, ‘আমি হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণভাবে টোলমুক্তভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার অনুমতি দিচ্ছি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর আরোপিত অবরোধও অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি।’
ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ চলুক।’
ট্রাম্পের ঘোষণার কিছুক্ষণ পর ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ‘তাৎক্ষণিক অবসান’ ঘটেছে।
গারিবাবাদি জানান, চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে আগামী দুই মাসের মধ্যে উভয় পক্ষ নতুন করে আলোচনা শুরু করবে। তার ভাষ্য, বর্তমান চুক্তি উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুলে দিলেও পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ঘোষণায় উপস্থাপক বলেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান এবং ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’-এর সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এ সমঝোতাকে ইরানের জন্য ‘বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করছে।
গতকাল রোববার লেবাননে ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় ইরান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই তীব্র নিন্দা জানান। সেই উত্তেজনার মধ্যেই শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা এলো।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইসরায়েলি হামলার কড়া সমালোচনা করেন ইরানের আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে চালানো ওই হামলা নিয়ে ইসরায়েলের দাবি ছিল, তারা ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করেছে।
তবে গালিবাফ বলেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের ‘ইচ্ছা ও সক্ষমতা’ রাখে না।
এ ছাড়া বৈরুতে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইরান এর ‘কঠোর জবাব’ দেবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। দেশটির সামরিক কমান্ড জানায়, তাদের ‘আঙুল ট্রিগারে রয়েছে’ এবং তারা ‘শত্রুর হৃৎপিণ্ড’ লক্ষ্য করে গুলি চালাতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘আজ সকালে বৈরুতে এ হামলা হওয়া মোটেও উচিত হয়নি। বিশেষ করে এমন এক দিনে এ ঘটনা ঘটল, যখন আমরা ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির একেবারে কাছাকাছি রয়েছি।’
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা পরিকল্পিত এই চুক্তির অংশ নয়। লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান কমানোর মার্কিন দাবির বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর লেবাননে ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত আবার তীব্র হয়ে ওঠে।
এখনো চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ করা হয়নি। তবে শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, এই সমঝোতার আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছে।
এর আগে রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে, ইরানের বন্দরগুলোয় মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য আরও ৬০ দিন সময় রাখা হয়েছে।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে রাখা ২৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদ ছেড়ে দেবে। বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেবে। পাশাপাশি চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক স্থাপনা সম্প্রসারণ না করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে তেহরান।

