আকীল আকতাব
তাইওয়ানের দা’আন নদীর দুর্গম উপত্যকায় পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে উঁচু পরিচিত গাছটি শনাক্ত করেছেন নাছোড়বান্দা গবেষকেরা। এক দশকের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পাওয়া এই বিশাল ফার গাছটির নাম রাখা হয়েছে “দা’আন নদীর স্বর্গ তরবারি” (The Heaven Sword of the Da’an River)। নামটি এসেছে জিন ইয়ং-এর মার্শাল আর্ট উপন্যাসের একটি কাল্পনিক অস্ত্র থেকে।
গবেষকদের মতে, গাছটি Taiwania cryptomerioides প্রজাতির। এর উচ্চতা ৮৪.১ মিটার (২৭৬ ফুট) এবং বয়স প্রায় ১,০০০ বছর। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাছ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড ন্যাশনাল পার্কের “হাইপেরিয়ন”, উচ্চতা ১১৬ মিটার (৩৮১ ফুট)। তাইওয়ানের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকার আদিবাসী রুকাই সম্প্রদায় এই গাছটিকে “চন্দ্রস্পর্শী বৃক্ষ” নামে ডাকে।
তাইওয়ানের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা বনভূমি। ২০১৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী রয়েছে ৯৫০ মিলিয়ন গাছ। ঘন বন আর খাড়া পাহাড়ের কারণে এই বিশাল গাছটি দীর্ঘদিন আড়ালে ছিল।
‘স্বর্গ তরবারি’ অনুসন্ধানের নেতৃত্ব দেয় তাইওয়ান বৃক্ষ সন্ধানী (Taiwan Tree Seekers) দল। এতে যুক্ত আছেন পর্বতারোহী, বাস্তুবিদ, ভূতত্ত্ববিদ এবং রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞরা। ২০১৪ সাল থেকে তারা দ্বীপজুড়ে সবচেয়ে উঁচু গাছগুলো শনাক্ত ও নথিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন।
এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল আরও আগে, প্রায় ১২ বছর পূর্বে। তখন গবেষকেরা ‘ত্রি ভগ্নি’ (Three Sisters) নামে তিনটি বিশাল ফার গাছ নথিবদ্ধ করছিলেন। সেই কাজ থেকেই বড় পরিসরের এই প্রকল্পের জন্ম।
দিনে দিনে বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি দলে যুক্ত হন স্থানীয় বাসিন্দা ও পেশাদার পর্বতারোহীরা। অনেক সময় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছাতে কয়েক দিনের দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রকৃতির প্রতি গভীর আগ্রহই এই অভিযানের প্রধান চালিকাশক্তি।
প্রযুক্তিগতভাবে এই অনুসন্ধানে লেজার রশ্মি প্রযুক্তি (LiDAR – Light Detection and Ranging) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আকাশ থেকে লেজার রশ্মি পাঠিয়ে বনাঞ্চলের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়। তবে পাহাড়ি ভূখণ্ড অনেক সময় এই মডেলকে বিভ্রান্ত করে, ফলে উচ্চতা নির্ধারণে ভুলও দেখা দেয়। এই কারণেই পরে সরেজমিন যাচাই অপরিহার্য
হয়ে ওঠে।
২০২০ সালে স্বেচ্ছাসেবক বিজ্ঞানীদের সহায়তায় সংগৃহীত ডেটা পুনরায় বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর ২০২২ সালে প্রকাশিত হয় তাইওয়ানের বৃহৎ গাছের অবস্থানের মানচিত্র (Taiwan Giant Tree Map), যেখানে ৬৫ মিটারের বেশি উচ্চতার ৯৪১টি গাছ চিহ্নিত করা হয়।
২০২৩ সালের শুরুতে চন্দ্র নববর্ষের সময় দলটি চূড়ান্ত অনুসন্ধানে নামে। লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে উঁচু গাছটি শনাক্ত করা। “স্বর্গ তরবারি” গাছের অবস্থানে পৌঁছাতে গবেষকদের ২০ কিলোমিটারের বেশি দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হয়। এরপর দুই দিনের কঠিন পাহাড়ি ট্রেক শেষে শুরু হয় মূল অভিযান।
ড. হু জানান, গাছে ওঠার আগে ড্রোন দিয়ে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য উচ্চতা নির্ধারণে তারা ফিতা নামিয়ে সরাসরি মাপ নেওয়ার পদ্ধতিই বেছে নেন।
পরিমাপ শেষে উচ্চতা ৮৪.১ মিটার নিশ্চিত হলে পুরো দল স্বস্তি পায়। এক দশকের পরিশ্রমের ফল তখন তাদের সামনে বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণাটি “Frontiers in Forests and Global Change” জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
কলাম্বিয়া ল্যান্ড ট্রাস্টের LiDAR বিশেষজ্ঞ এবং “হাইপেরিয়ন” গাছের সহ-আবিষ্কারক মাইকেল টেলর বলেন, অনেক গবেষণা এখনো সফটওয়্যার-নির্ভর ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত ভরসা করে, যা সবসময় নির্ভুল নয়। তবে প্রকৃত নির্ভুলতা আসে সরেজমিন পরিমাপ থেকেই।
তাইওয়ান ফরেস্ট্রি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ড. রেবেকা চিয়া-চুন হু বলেন, উচ্চ বৃষ্টিপাত এবং স্থিতিশীল জলবায়ু এই অঞ্চলে দীর্ঘজীবী ও বিশাল গাছের বিকাশে সহায়তা করেছে। তিনি আরও জানান, ১৯১২ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে কাঠ আহরণে অনেক বন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল অনেক প্রাচীন গাছকে প্রাকৃতিকভাবে রক্ষা করেছে, যেগুলোর বড় অংশ এখন সংরক্ষিত এলাকায় রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার “বৃক্ষ প্রকল্পগুচ্ছ” (The Tree Projects)-এর পরিচালক স্টিভ পিয়ার্স বলেন, এই কাজ বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণের একটি অনন্য উদাহরণ।
গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো এই ধরনের বিশাল গাছ কোন পরিবেশে সবচেয়ে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে তা নির্ধারণ করা। পাশাপাশি কার্বন সংরক্ষণ ও বন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গবেষণা চলছে। তাদের মতে, বড় গাছ শুধু কার্বন শোষণই করে না, বরং বনজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে এসব প্রাচীন গাছ ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গবেষকেরা মনে করেন, এই ধরনের বৃহৎ গাছের অবস্থান ও পরিবেশগত কেন্দ্র চিহ্নিত করা ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


