স্পোর্টস ডেস্ক
ফুটবল মাঠে ডেভিড বনাম গোলিয়াথের রূপকথা প্রতিদিন লেখা হয় না। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই সেই রূপকথা লিখল কেপ ভার্দে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী স্পেনকে রুখে দিয়ে গোলশূন্য ড্র আদায় করেছে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি। এই ঐতিহাসিক অর্জনের কেন্দ্রে ছিলেন এক ব্যক্তি, ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক জোসিপ ডিয়াজ ভোজিনহা।
স্কোরলাইন হয়তো ০-০, কিন্তু ম্যাচের গল্প ছিল একপাক্ষিক আক্রমণ আর অবিশ্বাস্য প্রতিরোধের। বলের দখল থেকে শুরু করে আক্রমণের সংখ্যা, প্রায় সব পরিসংখ্যানেই এগিয়ে ছিল স্পেন। তবে কেপ ভার্দের গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ভোজিনহা যেন একাই বদলে দিয়েছেন ম্যাচের গতিপথ। তার অসাধারণ সেভে বারবার হতাশ হয়েছে স্প্যানিশ আক্রমণভাগ।
শুরু থেকেই নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে থাকে স্পেন। দ্রুত পাস, ধারাবাহিক আক্রমণ এবং প্রতিপক্ষের অর্ধে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে তারা কেপ ভার্দেকে চাপে রাখে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে সেই চাপ আরও বাড়ে। ফেরান তোরেস গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও সফল হতে পারেননি; তার শক্তিশালী শট ক্রসবারে আঘাত হানে। এরপর তোরেস ও আয়মেরিক লাপোর্তের আরও দুটি বিপজ্জনক প্রচেষ্টা দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করেন ভোজিনহা। ফলে আধিপত্য বিস্তার করেও গোলশূন্য সমতা নিয়েই বিরতিতে যেতে হয় স্পেনকে।
দ্বিতীয়ার্ধেও দৃশ্যপট খুব একটা বদলায়নি। গোলের খোঁজে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে লা রোজা। কিন্তু কেপ ভার্দের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ এবং ভোজিনহার অসাধারণ উপস্থিতি স্পেনের সব পরিকল্পনাই ভেস্তে দেয়। ম্যাচের ৭১তম মিনিটে পরিস্থিতি বদলাতে মিকেল মেরিনোর পরিবর্তে মাঠে নামানো হয় তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালকে। ১৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের উপস্থিতিতে স্পেনের আক্রমণে গতি ও সৃজনশীলতা বাড়লেও গোলের দেখা মেলেনি। ভোজিনহার সামনে যেন সব পথই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে কেপ ভার্দে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক অবস্থানে আটকে থাকেনি। সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে তারা। যদিও স্পেনের শক্তিশালী রক্ষণভাগের কারণে সেই আক্রমণগুলো শেষ পর্যন্ত বড় কোনো হুমকিতে পরিণত হয়নি। তবু ম্যাচজুড়ে তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল এবং আত্মবিশ্বাস প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন ভোজিনহা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পারফরম্যান্স নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই তার অসাধারণ সেভগুলোকে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘শাওলিন সকার’-এর কাল্পনিক দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বাস্তবের মাঠে তিনি যা দেখিয়েছেন, তা যেন কল্পনাকেও হার মানায়।
পরিসংখ্যানও ভোজিনহার কীর্তির গুরুত্ব তুলে ধরছে। তিনি অন্তত সাতটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দেন। শুধু সেভেই নয়, বল বিতরণেও ছিলেন কার্যকর। ৪২টি পাসের মধ্যে ২৯টি সফল করে ৬৯ শতাংশ পাস-সফলতার হার ধরে রাখেন।
এই ম্যাচে আরেকটি অনন্য রেকর্ডও গড়ে ওঠে। ইয়ামালের বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৪২ দিন, আর ভোজিনহার ৪০ বছর ২২ দিন। দুই ফুটবলারের মধ্যে ২১ বছর ৪৫ দিনের এই ব্যবধান বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ বয়সের ব্যবধান।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগে ভেঙে পড়েন ভোজিনহা। চোখের জল লুকাতে পারেননি তিনি। সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফল এনে দেওয়ার মুহূর্ত খুব কম খেলোয়াড়ই অনুভব করার সুযোগ পান।
স্পেনের জন্য এটি হতাশার রাত হলেও কেপ ভার্দের জন্য এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা, যা তাদের ফুটবল ইতিহাসের গর্ব হয়ে থাকবে। সেই গল্পের প্রধান নায়ক নিঃসন্দেহে জোসিপ ডিয়াজ ভোজিনহা। অবশ্য তিনি আজ রাতেই বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।

