নিজস্ব সংবাদদাতা
বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা রুখতে দেশবাসীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পতিত স্বৈরাচারী সরকারকে নিষ্ঠুর শাসক ‘কংসের’ সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেছেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর এখন নতুন করে দেশ পুনর্গঠনের পালা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশব্যাপী পুরোহিত ও সেবাইতদের জন্য সরকারি সম্মানী প্রদান কার্যক্রমেরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজনে হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথির তাৎপর্য তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আবহমানকাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে এলেও কিছু স্বার্থান্বেষী মহল যুগে যুগে সমাজে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছে।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে কংসের মতোই এক নিষ্ঠুর শাসক দেশের ওপর চেপে বসেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সেই কংসরূপী ফ্যাসিস্টদের পতন হয়েছে। বর্তমানে দেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য।
সমাজে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতির কড়া সমালোচনা করেন তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘সংখ্যাগুরু’ ধারণাটি নিতান্তই আপেক্ষিক এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ ধরনের পরিচয়ের কোনো ভিত্তি নেই। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিজেদের পরিচয় কেবল ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখতে স্বাধীনতার ঘোষকের রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ই মূলভিত্তি।
একটি বৈষম্যহীন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সরকারপ্রধান জানান, রাষ্ট্র তার সাধ্য অনুযায়ী সব নাগরিককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে এবং নাগরিকদেরও রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতা চালুর মতো বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
জন্মাষ্টমীর আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানে নয়জন পুরোহিত ও সেবাইতের হাতে সম্মানীর অর্থ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে সারা দেশে অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের ব্যাংক হিসাবেও এই অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহার গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
পরিশেষে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমী এবং আসন্ন দুর্গাপূজার আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহনশীলতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এবং ‘নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’ নীতিতে বিশ্বাসী বর্তমান সরকার প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন তিনি। একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে সব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণই আগামী দিনে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে আরও মজবুত করবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

