নিজস্ব প্রতিবেদক
মে মাসের মাঝামাঝি এসে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের নদ-নদী ও হাওরাঞ্চলের পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। আকস্মিক এই পানি বৃদ্ধির ফলে মাঠের অবশিষ্ট বোরো ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো নিয়ে নদীপাড়ের গ্রামীণ জনপদে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা থাকায় কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও দীর্ঘ হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টির পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও ভারী বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে গত তিন দিনে মোট ২৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই বৃষ্টি হয়েছে ১১৫ মিলিমিটার। এই সময়ে সুরমা নদীর পানি নতুন করে ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেলেও তা বিপদসীমার ১.৭২ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, চেরাপুঞ্জি ও স্থানীয়ভাবে ভারী বৃষ্টির কারণে পানি আরও বাড়লে ফসলের কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও আপাতত বড় ধরনের কোনো বন্যা পরিস্থিতির সম্ভাবনা তারা দেখছেন না। তবে কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সুধীমহল বলছেন, এবারের বৈশাখের শুরু থেকেই একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকদের ধান ঘরে তুলতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে।
‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’-এর সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন এ বছর কৃষকদের পিছু ছাড়ছে না। এক দিন রোদ থাকলে পরের দুই দিনই বৃষ্টি হচ্ছে। অন্তত এক সপ্তাহ টানা রোদ থাকলে কৃষকেরা অবশিষ্ট ধান নির্বিঘ্নে ঘরে তুলতে পারতেন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।” অনেক নিচু এলাকায় কেটে রাখা ধান এখনো পানির ওপর ক্ষেতেই ভেসে রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি ছোট-বড় হাওরে এবার মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ টন চাল। সরকারি হিসাব মতে, এ পর্যন্ত জেলায় গড়ে ৮৭.৪০ শতাংশ (১ লাখ ৯৪ thousand ৭৬৮ হেক্টর) জমির ধান কাটা সম্পন্ন হলেও মাঠ ও হাওরে এখনো প্রায় ১৩ শতাংশ ধান কাটার বাকি রয়ে গেছে। ১০ দিন আগের প্রাথমিক সরকারি হিসাবেই অতিবৃষ্টি ও ঢলে প্রায় ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৫০০ কোটি টাকারও বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, ফসলের চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। তবে বৃষ্টি এভাবে অব্যাহত থাকলে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ এবং আর্থিক লোকসানের অংক আরও অনেক বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

