আন্তর্জাতিক ডেস্ক

চীনের ইয়েলো মাউন্টেনের হাজার বছরের পুরোনো এক পাইনগাছ রক্ষায় বছরের পর বছর পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন হু শিয়াওসোং। প্রতিকূল আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পর্যটকদের চাপ থেকে ঐতিহাসিক এই গাছটিকে নিরাপদ রাখাই তাঁর একমাত্র দায়িত্ব।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ হাজার ৫০০ ফুটের বেশি উচ্চতায় অবস্থিত হুয়াংশান পর্বতে থাকা ‘ইংকেসোং’ বা ‘গেস্ট-গ্রিটিং পাইন’ গাছটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন হু।  হু হলেন ১৯তম প্রজন্মের ব্যক্তি, যিনি একরকম গাছটির ‘দেহরক্ষী’ হিসেবে কাজ করছেন।

তাঁর কাজ হলো তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অতিরিক্ত উৎসাহী পর্যটকদের হাত থেকে এ ঐতিহাসিক গাছকে রক্ষা করা। তিনি ১৬ বছর ধরে প্রতিদিন নিয়ম করে গাছটি পরীক্ষা করছেন এবং প্রায় দুই ঘণ্টা পরপর টহল দিয়ে এর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।

চীনের পূর্বাঞ্চলীয় আনহুই প্রদেশের বিখ্যাত এই পাইনগাছটি শুধু একটি প্রাকৃতিক নিদর্শন নয়, বরং আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। শক্ত গ্রানাইট পাথরের বুক চিরে বেড়ে ওঠা গাছটির অদ্ভুত আকৃতি ও সৌন্দর্য এটিকে ইয়েলো মাউন্টেনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত করেছে।

হু বলেন, গাছটি তাঁর কাছে পরিবারের একজন সদস্যের মতো। তীব্র আবহাওয়া, অতিরিক্ত পর্যটকের আগ্রহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি—সবকিছু থেকে এটিকে রক্ষা করাই তাঁর কাজ।

তিনি বলেন, পর্যটকদের আচরণ আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিও গাছটির নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২০ সালে গাছের আশপাশে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি অ্যালার্ম ব্যবস্থা চালু করা হয়, যার সঙ্গে একটি অ্যাপ যুক্ত রয়েছে। কেউ নির্ধারিত সীমার কাছাকাছি গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়।

হু জানান, সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দ্রুত টহল দেওয়া সম্ভব হয়, এতে সময় বাঁচে এবং গাছটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়। তবে বয়সের কারণে গাছটি এখন তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

বিশেষ করে বরফ-শীতল বৃষ্টি এই পাইনগাছের জন্য বড় হুমকি বলে জানান হু। এমন আবহাওয়ায় ডালপালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তীব্র বাতাস বা বন্যার মতো পরিস্থিতিতে তাঁরা সারা রাত জেগে গাছটির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।

চীনের ন্যাশনাল ক্লাইমেট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পূর্বাঞ্চলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আগের তুলনায় বেশি বিস্তৃত এলাকায় তীব্র বরফ-শীতল বৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে, যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইংকেসোং গাছটির সুরক্ষা শুধু একজন রক্ষকের দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত সপ্তাহে হুয়াংশানে অনুষ্ঠিত এক বৈশ্বিক সংলাপে বিভিন্ন দেশের মেয়ররা জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন।

নেপালের পোখারা শহরের মেয়র ধন রাজ আচার্য বলেন, পাহাড়ি এলাকার শহর হিসেবে তাঁদের সমস্যার সঙ্গে হুয়াংশানের অনেক মিল রয়েছে। অতিবৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস ও দ্রুত নগরায়ণের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁদের।

বিশ্বের বিভিন্ন পর্যটননির্ভর শহরের প্রতিনিধিরা হুয়াংশানের ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা থেকেও শিক্ষা নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ইতালির গ্রাদারা শহরের মেয়র ফিলিপ্পো গাস্পেরি বলেন, মাত্র ৫ হাজার মানুষের শহরে বছরে ৫ লাখের বেশি পর্যটকের আগমন বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।

ইয়েলো মাউন্টেনে প্রতিবছর লাখো পর্যটকের চাপ সামলাতে চীন বিস্তৃত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। একই আলোচনায় কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি চীনের বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহও প্রকাশ করেন।

প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা, পর্যটন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার প্রশ্নে হু শিয়াওসোংয়ের পাহারায় থাকা এই প্রাচীন পাইনগাছ এখন শুধু একটি গাছ নয়, বরং পরিবর্তিত বিশ্বের সামনে সংরক্ষণের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Share.
Exit mobile version