শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যসমুদ্রে থাকা প্রমোদতরী ‘এমভি হন্ডিয়াস’কে ঘিরে হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হলেও এখনই বড় ধরনের মহামারীর আশঙ্কা দেখছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এবং নতুন আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৯ জনের শরীরে হান্টাভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আরও দুইজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। ইতোমধ্যে তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। মৃতদের মধ্যে একজন নেদারল্যান্ডসের নাগরিক, একজন জার্মান নারী এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আরেক নারী রয়েছেন।

ফ্রান্সের এক নারী রোগী বর্তমানে প্যারিসের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকেরা তাকে কৃত্রিম ফুসফুসের সহায়তা দিচ্ছেন। অন্যদিকে স্পেনে শনাক্ত হওয়া এক রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং তার মধ্যে মৃদু উপসর্গ দেখা গেছে বলে জানানো হয়েছে।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে। নেদারল্যান্ডসের নিজমেগেন শহরের একটি হাসপাতালে ১২ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা আক্রান্ত রোগীর নমুনা পরীক্ষার সময় যথাযথ সুরক্ষা প্রোটোকল অনুসরণ করেননি। একই সঙ্গে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালিতেও সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুর ও বন্য দন্তপ্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। তবে দক্ষিণ আমেরিকায় শনাক্ত হওয়া ‘আন্দিজ’ ধরনের হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে এমভি হন্ডিয়াসে ভ্রমণ করা যাত্রীদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতা দেখানো হচ্ছে।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে জ্বর, তীব্র ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা, পেটব্যথা ও বমিভাব দেখা দিতে পারে। পরবর্তীতে অনেকের শ্বাসকষ্ট তৈরি হয়, যা দ্রুত জটিল অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। চিকিৎসকদের ভাষায়, সংক্রমণের সুপ্তিকাল তুলনামূলক দীর্ঘ হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই অন্যদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।

এমভি হন্ডিয়াস নামের প্রমোদতরীটি গত ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। জাহাজটিতে ২৩টি দেশের মোট ১৪৭ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য ছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ যাত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জাহাজে এখন কেবল ২৫ জন ক্রু সদস্য ও দুইজন চিকিৎসক অবস্থান করছেন। তারা জাহাজটিকে নেদারল্যান্ডসের রোটারডাম বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন।

জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, রোটারডামে পৌঁছানোর পর পুরো জাহাজ জীবাণুমুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণও চালিয়ে যাওয়া হবে। ফিলিপাইন দূতাবাস জানিয়েছে, তাদের ১৭ জন নাগরিক ইতোমধ্যে নিরাপদে নেদারল্যান্ডসে পৌঁছেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, দ্রুত উপসর্গ শনাক্ত করা এবং সংক্রমিত ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হান্টাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রাখা সম্ভব হবে।

Share.
Exit mobile version