বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্-শিল্পযুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর কীভাবে এর প্রভাব মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে প্রথমবারের মতো পৃথক মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)। সংস্থাটি বলেছে, এখন বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমা অতিক্রমের বাস্তবতা মোকাবিলার পাশাপাশি ‘ওভারশুট’ বা অতিরিক্ত উষ্ণতার সময়কাল যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইউএনইপি বলেছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্ব ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার সীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত ও ব্যাপকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণের মতো পদক্ষেপও প্রয়োজন হবে। খবর এএফপির।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত বছর ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা অতিক্রমের সম্ভাবনার কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে এবারই প্রথম জাতিসংঘের কোনো সংস্থা এ বিষয়টি সরাসরি বিবেচনায় নিয়ে পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করল।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাক্-শিল্পযুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে গেলে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে প্রায় ২০০টি দেশ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে এই সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে সম্মত হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক উষ্ণতার প্রবণতায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম এখন অনেকটাই অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু নীতিতে ‘ওভারশুট’ মোকাবিলা নতুন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের বিজ্ঞানী রিচার্ড বেটস বলেন, এটি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়। উষ্ণতা আরও বাড়লেও তা সীমিত রাখার জন্য এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি শুধু পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে—এমন সতর্কবার্তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়, তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরেক সহ-লেখক ডেব্রা রবার্টস বলেন, নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ‘খেলার নিয়ম এখন পাল্টে যাচ্ছে’। তার মতে, ওভারশুটের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান জলবায়ু শাসনব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে হবে।
তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের এই অবস্থান নিয়ে জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক দশক আগে প্যারিস চুক্তিতে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা নির্ধারণের পর থেকেই তারা এ লক্ষ্য ধরে রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন।
গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের উপ-প্রোগ্রাম পরিচালক জ্যাসপার ইনভেন্টর বলেন, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লড়াই ছেড়ে দেওয়া বা আত্মসমর্পণের কারণ নেই। জলবায়ুবিজ্ঞানী ও নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ারও প্রতিবেদনটির সমালোচনা করে বলেন, এটি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় লড়াইয়ের আহ্বানের বদলে উদাসীনতার বার্তা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যের অন্যতম জোরালো সমর্থক। লক্ষ্যটি কঠিন হয়ে উঠলেও ধনী দেশগুলোকে এটি পরিত্যাগ না করার আহ্বান জানিয়ে আসছে তারা।
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে ১৮৫০-১৯০০ সময়কালের তুলনায় বিশ্ব ইতোমধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হয়েছে। রেকর্ড সংরক্ষণের ইতিহাসে গত তিন বছরও ছিল সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর মধ্যে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অতিরিক্ত উষ্ণতা চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি বরফের স্তর ধসে পড়া ও প্রবালপ্রাচীর বিলীন হওয়ার মতো ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর দিকে পৃথিবীকে আরও ঠেলে দিতে পারে।
ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকলে ভালো কোনো ফলাফল নেই। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য এখনো বহাল রয়েছে এবং এ লক্ষ্য অর্জনে ভিন্নভাবে কাজ করতে হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেসও বলেছেন, শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা আবার ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব। তার ভাষায়, ১.৫ ডিগ্রির জন্য লড়াই মানেই মানবতার জন্য লড়াই।
ইউএনইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই লক্ষ্য অর্জনে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমানোর পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন অপসারণের ভূমিকা খুবই সীমিত।
জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের একটি অংশ কার্বন অপসারণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সমাধানের ওপর নির্ভর করে নিঃসরণ কমানোর কার্যক্রম বিলম্বিত করা যাবে না; বরং এখনই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

