২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও নীতিগত পদক্ষেপ তুলে ধরতে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ব্রিফিং করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বিডার ১৭টি খাতভিত্তিক ও নীতিগত সুপারিশের মধ্যে ১৪টি, অর্থাৎ ৮২ শতাংশ, সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে জাতীয় বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।
আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ ভবনে অনুষ্ঠিত এ ব্রিফিংয়ে বাজেটের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার—নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ (ডিরেগুলেশন), দীর্ঘমেয়াদি কর-স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত খাতের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা—তুলে ধরা হয়।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। স্বাগত বক্তব্য দেন বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি।
অনুষ্ঠানে বিডা ও এনবিআরের কর্মকর্তারা যৌথভাবে বাজেটের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন। তারা জানান, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ-সংক্রান্ত ১৯টি সুপারিশের মধ্যে ১২টি, অর্থাৎ ৬৩ শতাংশ, গ্রহণ করা হয়েছে। এসব সুপারিশ বিডা, এনবিআর এবং অন্যান্য বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার অংশগ্রহণে চার দফা আন্তঃসংস্থা পরামর্শ ও একাধিক কারিগরি প্রাক-বাজেট বৈঠকের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ব্যবসা সহজীকরণে বাজেটে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে ব্যবসায়িক অনুমোদনের জন্য ১৪ দিনের সেবা নিশ্চয়তা, নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের ব্যবস্থা, বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর করা এবং বন্ড সুবিধার আওতা সম্প্রসারণ।
এ ছাড়া অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) ব্যবস্থার আওতায় দ্রুত শুল্ক ছাড়ের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। শুল্ক ছাড়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি পরীক্ষাগারের পরীক্ষার প্রতিবেদনও গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে।
মুনাফা প্রত্যাবাসন ও কর প্রশাসন সহজ করতে একাধিক সংস্কার আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুনাফা ও এনআইটিএ হিসাবের অর্থ প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই অর্থ প্রত্যাবাসনের সীমা বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক ইলেকট্রনিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিল, স্বয়ংক্রিয় বিআইএন ইস্যু ও ভ্যাট রিফান্ড এবং কর নিরীক্ষা শেষ করার জন্য এক বছরের সময়সীমা নির্ধারণ। পাশাপাশি কর নির্ধারণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে প্রয়োজনীয় অগ্রিম জমার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহিত করতে শুল্কমুক্ত আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, হস্তশিল্প এবং পুনর্ব্যবহৃত বস্ত্রজাত পণ্যসহ আরও ১০টি খাত ব্যাংক গ্যারান্টির ভিত্তিতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাবে।
বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত আয়করের সীমা ও করহার ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত আগাম নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, জাহাজ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ এবং স্টার্টআপ খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর ও ভ্যাট সুবিধা চালু করা হয়েছে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনে ১০ বছরের ধাপে ধাপে কর অব্যাহতির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং মূল্যবান ধাতু খাতের জন্যও লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচিত যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো বা শূন্যে নামিয়ে আনা, স্টার্টআপে অর্থায়নের সুবিধা, রপ্তানিমুখী উৎপাদনে সহায়তা এবং অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোতে শতভাগ বিদেশি মালিকানার সুযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘এই বাজেট থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, এটি নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। দ্বিতীয়ত, বাজেটটি বাংলাদেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস ও সরবরাহ শৃঙ্খল অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যকে এগিয়ে নেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় তা মোকাবিলা করা সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট।’
ব্রিফিংয়ে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি ছাড়াও জেট্রো, কোট্রা, ফিকি, ইউরোচেম, অ্যামচেম, সিইএবি, ওসিআইএবি, বিজিএমইএ, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া বাকি সুপারিশগুলো নিয়ে বিডা ও এনবিআর আলোচনা অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি ঘোষিত পদক্ষেপগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এনবিআর, বিডা এবং অন্যান্য বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় আরও জোরদার করা হবে।

