প্রচণ্ড দাবদাহ ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির ঘাটতিতে ইউরোপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর জলস্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, উপগ্রহচিত্রে মহাকাশ থেকেও নদীগুলোর সংকট স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি ইউরোপের পরিবহন, জ্বালানি, বাণিজ্য ও পরিবেশে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
উপগ্রহ থেকে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, একসময় পানিতে পরিপূর্ণ থাকা নদীগুলোর বিস্তীর্ণ অংশ এখন শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের স্বাভাবিক জলপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নের শিকার হওয়া মহাদেশ। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানে গ্রীষ্মকাল আগের তুলনায় আরও দীর্ঘ ও তীব্র হচ্ছে। একের পর এক দাবদাহ এবং বৃষ্টির ঘাটতিতে নদী ও মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে দানিউব ও রাইন নদী। ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিউবের পানির স্তর হাঙ্গেরিতে ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। সংবাদ সংস্থা এপির তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার বুদাপেস্টে নদীটির জলস্তর মাত্র ৪ ইঞ্চিতে নেমে আসে, যা ২০১৮ সালের আগের রেকর্ডেরও নিচে।
দানিউবের পানি কমে যাওয়ায় হাঙ্গেরির পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। দেশের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এই কেন্দ্রটি বর্তমানে মাত্র ১০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। পানির অভাবে একটি ছাড়া বাকি সব চুল্লি বন্ধ রাখতে হয়েছে। একই ধরনের সংকটে পড়েছে রোমানিয়াও। পানিপ্রবাহ বাড়াতে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নদীর জলস্তর কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পর্যটন শিল্পেও। অনেক রিভার ক্রুজ বাতিল করতে হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও নদীর তলদেশ থেকে বেরিয়ে আসছে বহু পুরোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন। উত্তর বুলগেরিয়ায় একটি প্রাচীন ম্যামথের দেহাবশেষ এবং সার্বিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া একটি নাৎসি যুদ্ধজাহাজ আবার দৃশ্যমান হয়েছে।
সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ইউরোপের অন্যতম বাণিজ্যিক নৌপথ রাইন নদীও। সুইস আল্পস থেকে উৎপন্ন এই নদীর পানি কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অনেক কম মাল বহন করতে হচ্ছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে নদীপথের পরিবর্তে রেল ও সড়কপথ ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও ঘন ঘন দেখা দেবে। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক রিচার্ড অ্যালান বলেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, সেটি ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত। এ অবস্থা মোকাবিলায় দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

