স্পোর্টস ডেস্ক

আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের এক দুর্দান্ত ফুটবল নাটকে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে ইংল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বের এই হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ে দর্শকরা উপভোগ করেছেন ছয় গোলের রুদ্ধশ্বাস এক ম্যাচ। থ্রি লায়ন্সদের জয়ের কেন্দ্রে ছিলেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন, যিনি করেছেন জোড়া গোল। দলের হয়ে বাকি দুটি গোল আসে জুড বেলিংহাম ও মার্কাস রাশফোর্ডের পা থেকে। ক্রোয়েশিয়ার হয়ে মার্তিন বাতুরিনা ও পেতার মুসা গোল করলেও শেষ পর্যন্ত তা পরাজয়ের ব্যবধানই কমিয়েছে।

শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে মরিয়া ছিল ইংল্যান্ড। গতি, নিখুঁত পাসিং এবং মাঝমাঠে জুড বেলিংহাম ও ননি মাদুয়েকের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে ক্রোয়াট রক্ষণভাগকে বেশ অস্বস্তিতেই দেখা যাচ্ছিল। সেই চাপের ফল আসে ১২তম মিনিটে।

বক্সের ভেতরে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ননি মাদুয়েকেকে ফাউল করে বসেন ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদরিচ। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে স্পট কিক নিতে এগিয়ে যান হ্যারি কেইন। প্রথম প্রচেষ্টায় দারুণ দক্ষতায় বল ঠেকিয়ে দেন দমিনিক লিভাকোভিচ। কিন্তু ভিএআরের পর্যালোচনায় দেখা যায়, শট নেওয়ার আগেই গোললাইন ছেড়ে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। ফলে পুনরায় পেনাল্টি নেওয়ার নির্দেশ আসে। দ্বিতীয় সুযোগে আর ভুল করেননি কেইন। ঠাণ্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে জালে বল পাঠিয়ে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন তিনি।

এই গোলের মাধ্যমে টাইব্রেকার বাদে বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এককভাবে শীর্ষে উঠে যান ইংলিশ অধিনায়ক।

তবে গোল হজম করেও ভেঙে পড়েনি ক্রোয়েশিয়া। ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে জ্লাতকো দালিচের দল। ৩৬তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে মার্তিন বাতুরিনার দুর্দান্ত কোনাকুনি শট জালে জড়ালে সমতায় ফেরে ক্রোয়াটরা।

কিন্তু প্রথমার্ধের শেষ শব্দটি বলেছিলেন আবারও কেইন। বিরতির তিন মিনিট আগে ডেকলান রাইসের নেওয়া কর্নার থেকে অসাধারণ হেডে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যারি লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ডেও ভাগ বসান ইংলিশ অধিনায়ক।

তবুও প্রথমার্ধের নাটক তখনও শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে ইভান পেরিসিচের নিখুঁত হেড পাসে পা ছুঁইয়ে বল জালে জড়ান পেতার মুসা। ফলে ২-২ সমতার রোমাঞ্চ নিয়ে বিরতিতে যায় দুই দল।

দ্বিতীয়ার্ধে যেন একেবারে নতুন রূপে মাঠে নামে টমাস টুখেলের শিষ্যরা। বিরতির পর খেলা শুরু হওয়ার মাত্র দুই মিনিটের মাথায় ডান প্রান্ত দিয়ে দুরন্ত গতিতে বক্সে ঢুকে কোনাকুনি শটে গোল করেন জুড বেলিংহাম। ৪৭তম মিনিটের সেই গোল আবারও ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেয়।

এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের লাগাম পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় থ্রি লায়ন্সরা। ক্রোয়েশিয়া কয়েকবার সমতায় ফেরার চেষ্টা করলেও ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ তা সফল হতে দেয়নি। ম্যাচের শেষ দিকে ক্রোয়াটদের ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে বদলি হিসেবে নামা মার্কাস রাশফোর্ড চতুর্থ গোলটি করেন। সেই গোলই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ড প্রতিপক্ষের গোলমুখে ২২টি শট নিয়েছে, যার ১১টিই ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে শেষ দিকে জর্দান পিকফোর্ডের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ ক্রোয়েশিয়ার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পথও বন্ধ করে দেয়।

ম্যাচ শেষে জোড়া গোলের নায়ক হ্যারি কেইন স্বীকার করেন, দুই অর্ধে ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্স ছিল ভিন্নধর্মী।

‘প্রথমার্ধে আমরা ভালো খেলেছি, কিন্তু যেভাবে গোল হজম করেছি তা হতাশাজনক। মনে হচ্ছিল আমরা কিছুটা ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলাম,’ বলেন ইংলিশ অধিনায়ক।

বিরতির পর দলের বদলে যাওয়া চেহারার পুরো কৃতিত্ব তিনি দেন কোচ টমাস টুখেলকে।

কেইনের ভাষায়, ‘কোচ আমাদের বলেছিলেন, যদি হারতেই হয়, তাহলে নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেই হারব। দ্বিতীয়ার্ধে আমরা ঠিক সেটাই করেছি। আমরা পুরো শক্তি আর গতি দিয়ে খেলেছি, আর ক্রোয়েশিয়া সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।’

এই দাপুটে জয়ের পর ডালাসের গ্যালারিতে আবারও জোরে শোনা গেছে ইংলিশ ফুটবলের সেই চিরচেনা স্বপ্নের স্লোগান—‘ইটস কামিং হোম’।

Share.
Exit mobile version