স্পোর্টস ডেস্ক
বয়স, সময় কিংবা অর্জনের পাহাড়, কিছুই থামাতে পারেনি আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে যে গল্পের শেষ হয়েছিল বিশ্বকাপ হাতে, উত্তর আমেরিকার মাটিতে যেন সেই গল্পেরই নতুন অধ্যায় লিখলেন লিওনেল মেসি। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার মিশন শুরু করেই লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক আর্জেন্টিনা দলকে এনে দিল এক দারুণ জয়। তার অসাধারণ নৈপুণ্যে গ্রুপ ‘জে’-এর প্রথম ম্যাচে মরুশেয়াল আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ম্যাচটি ছিল মেসির ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। ছেলেদের ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নামার কীর্তি গড়েন তিনি। একই সঙ্গে দেশের জার্সিতে খেলেন নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। আর এমন এক স্মরণীয় রাতকে তিনি রাঙিয়ে দেন বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিকে।
ম্যাচ পরিচালনা করেন পোলিশ রেফারি শিমোন মারচিনিয়াক, যিনি ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিশ্বকাপে অভিষেকের ঠিক ২০ বছর পূর্তির দিনে দেশের হয়ে ২০০তম ম্যাচ খেলতে নামা মেসির জন্য এর চেয়ে বড় মঞ্চ আর কীই-বা হতে পারত!
শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার হাতে। পাস, পজিশন আর আক্রমণের ধারায় আলজেরিয়াকে চাপে রাখে লিওনেল স্কালোনির দল। পঞ্চম মিনিটেই বল জালে পাঠিয়ে গ্যালারিতে উল্লাসের ঢেউ তুলেছিলেন মেসি। কিন্তু সহকারী রেফারির অফসাইডের পতাকায় সেই উদযাপন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ভিএআরের রিপ্লেতেও দেখা যায়, অল্পের জন্য অফসাইডে ছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর একই কারণে বাতিল হয় আলজেরিয়ার একটি গোলও।
অবশেষে ১৭তম মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যার অপেক্ষায় ছিল পুরো স্টেডিয়াম। মাঝমাঠ থেকে রদ্রিগো দি পলের বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজের চিরচেনা ভঙ্গিতে এগিয়ে যান মেসি। কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেন দুর্দান্ত এক শট। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান দুই হাত ছুঁয়েও বল থামাতে পারেননি। বল জড়িয়ে যায় জালে, আর ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
বিরতির পরও আক্রমণের গতি কমেনি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রক্ষণ ও আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করতে একাধিক পরিবর্তন আনেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। মাঠে নামেন নাহুয়েল মলিনা, হুলিয়ান আলভারেজ ও নিকোলাস গঞ্জালেস।
৫৫ মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের দুর্দান্ত প্রচেষ্টা রুখে দেন লুকা জিদান। কিন্তু আর্জেন্টিনার আক্রমণের ঢেউ থামেনি। পাঁচ মিনিট পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন মেসি। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট প্রথম চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি জিদান। ফিরতি বলে সবার আগে পৌঁছে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৫-তে নিয়ে গিয়ে ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওর রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি।
এরপরও থামেননি মেসি। ৬৬ মিনিটে তাঁর আরেকটি শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন লুকা জিদান। তবে সেটি ছিল সাময়িক স্বস্তি। কারণ আর্জেন্টাইন অধিনায়ক তখন ছিলেন নিজের সেরা ছন্দে।
৭৬তম মিনিটে আসে রাতের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। বক্সের ভেতর বল পেয়ে একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে জালে বল পাঠান মেসি। পূর্ণ হয় বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। একই সঙ্গে তিনি স্পর্শ করেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের বিশ্বরেকর্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে উঠে আসেন শীর্ষে।
৮০তম মিনিটে যখন তাঁকে তুলে নেওয়া হয়, তখন পুরো অ্যারোহেড স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে সম্মান জানায় আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে। হাজারো দর্শকের করতালি আর ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’-এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর রেকর্ডগড়া রাত।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল হয়নি। লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক আর্জেন্টিনা দলকে এনে দিল ৩-০ ব্যবধানের এক দাপুটে জয়, আর এই জয় দিয়েই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কাতারে স্বপ্নপূরণ হয়েছিল, কিন্তু ক্ষুধা যে এখনো ফুরিয়ে যায়নি, কানসাস সিটির রাত সেটিই আরও একবার প্রমাণ করে দিল। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা যে এবারও অন্যতম প্রধান দাবিদার, সেই বার্তাও পৌঁছে গেল পুরো ফুটবল বিশ্বে।

