আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাংলাদেশসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আট দেশে হিমবাহ গলন, ভূমিধস ও হিমবাহ হ্রদ থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, আফগানিস্তান ও মিয়ানমার রয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীনের তিব্বতে হিমবাহধসের পর এই ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) জানিয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল আফগানিস্তান থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এই অঞ্চল থেকে এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছে এবং এসব নদীর অববাহিকা প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করে।
গবেষকদের মতে, হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটির স্তর নরম হয়ে যাওয়ায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি নদীর পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
আইসিআইএমওডির ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে ৬৩ হাজার ৭০০টির বেশি হিমবাহ রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০০০ সালের পর এই অঞ্চলের হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এই অঞ্চলের হিমবাহ ও তুষার গলে আমু দরিয়া, সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ইরাবতী, সালউইন, মেকং, ইয়াংসি, হলুদ নদী ও তারিমসহ ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থা পানির জোগান পায়। এসব নদীর অববাহিকা এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি, খাদ্য ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী ব্যবস্থা হিন্দুকুশ-হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গঙ্গা ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মা নামে পরিচিত। অন্যদিকে তিব্বতে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র চীন ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এখানে এর প্রধান ধারা যমুনা নামে পরিচিত।
গবেষকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ, তুষার ও পারমাফ্রস্টে দ্রুত পরিবর্তন ঘটায় পাহাড়ি ও ভাটি—উভয় অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়ছে। আইসিআইএমওডির ২০২৩ সালের গবেষণাতেও বলা হয়েছিল, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তিত হিমবাহ ও তুষার পরিস্থিতি বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং এর প্রভাব ভাটি অঞ্চলেও পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ, নদী ও পাহাড়ি এলাকার ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে আগাম সতর্কবার্তা এবং দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তবে হিমালয়ের প্রতিটি হিমবাহ ও পাথুরে ঢাল আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবে কঠিন। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবিদ্যুৎ বাঁধ, বড় শহর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
আইসিআইএমওডি জানিয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয়ের বরফ ও তুষারের পরিবর্তন এ অঞ্চলের পানি নিরাপত্তার পাশাপাশি এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণায়ও হিমবাহের দ্রুত ক্ষয় এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

