বুধবার, এপ্রিল ১৫, ২০২৬

ফিরোজ আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে দু’জন শিক্ষার্থী অনশন করছেন। দাবিটি রাজনৈতিক, কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং স্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে যে প্রশ্নটি আসলে শুধু এই দুইজনের নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
অনশনরত এই দুইজন ছাত্রশিবিরের কর্মী। তারা জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠনের সদস্য। এটি কোনো গোপন তথ্য নয়, কোনো অপরাধও নয়। কিন্তু তাদের পরিচয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। ডাকসুর নির্বাচিত শিবির সদস্যরা এবং বিভিন্ন সুশীল ব্যক্তিত্ব যারা সংহতি জানাতে গেছেন, তারা বারবার বলছেন ‘দুইজন সাধারণ শিক্ষার্থী’ অনশন করছেন। সাংগঠনিক পরিচয়টি সুকৌশলে অনুচ্চারিত রাখা হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, কেন?
জামায়াত এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ও জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল। শিবির তার ছাত্রসংগঠন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিসরে তারা এখন অনেক বেশি সক্রিয় ও দৃশ্যমান। তাহলে একটি ন্যায্য রাজনৈতিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রাখার প্রয়োজন পড়ছে কেন? কোন ভয়, কোন সংকোচ তাদের স্বনামে সামনে আসতে বাধা দিচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরনো ও পরিচিত চরিত্রের মুখোমুখি হতে হয় গুপ্ত রাজনীতির সংস্কৃতি। দশকের পর দশক ধরে এই দেশে রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে কার্যক্রম পরিচালনার একটি রীতি চলে আসছে। কখনো নিরাপত্তার কারণে, কখনো কৌশলগত সুবিধার জন্য, কখনো বা জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ তকমাটি সেই কৌশলেরই একটি পরিচিত অনুষঙ্গ।
কিন্তু এই কৌশল আদতে রাজনীতির প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস ও অসততার প্রকাশ। যদি দাবিটি ন্যায্য হয়, যদি কর্মসূচিটি নৈতিক হয়, তাহলে সেই দাবি ও কর্মসূচির পেছনে দাঁড়িয়ে নিজের নাম ও পরিচয় উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে সংকোচ কীসের? রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে ‘নিরপেক্ষ’ জনমত তৈরির চেষ্টা আসলে জনগণের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম প্রতারণা।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা। নাগরিকের অধিকার আছে জানার কে কোন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কথা বলছেন, কোন সংগঠনের পক্ষে দাবি তুলছেন। এই তথ্য গোপন রাখা কেবল অসৎ নয়, এটি গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিসরকেও সংকুচিত করে। মানুষ যখন জানতে পারে না যে তারা কার বক্তব্য শুনছে, তখন সুচিন্তিত মতামত গঠনের সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়।
শিবির বা জামায়াতের নেতাকর্মীরা যদি মনে করেন যে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ পেলে তাদের দাবি দুর্বল হয়ে যাবে, তাহলে সমস্যাটা পরিচয়ে নয় সমস্যাটা জনগণের সঙ্গে তাদের আস্থার সম্পর্কে। সেই আস্থা অর্জনের পথ হলো খোলামেলা রাজনীতি, আড়ালের রাজনীতি নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একটি কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর দেশ নতুন করে গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সব রাজনৈতিক দলকেই, বড় হোক বা ছোট, ডানপন্থী হোক বা বামপন্থী, স্বনামে সামনে আসতে হবে। লুকোচুরির রাজনীতি নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে বাধা, সহায়ক নয়।
রাজনীতি করুন। দাবি তুলুন। আন্দোলন করুন। কিন্তু নিজের নামে, নিজের পরিচয়ে।

Share.
Exit mobile version