আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে আয়োজিত আন্দোলনে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি আলোচনায় এসেছে। আরবি ও ফরাসি শব্দের মিশ্রণে তৈরি এই বাক্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডেও দেখা যায় এটি। আন্দোলনকারীদের একাংশের কাছে স্লোগানটি কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করার প্রতীক হয়ে ওঠে।
আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’র অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু’। অন্যদিকে ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’র অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। দুই ভাষার শব্দ মিলিয়ে তৈরি স্লোগানটির অর্থ সরাসরি স্পষ্ট নয়। তবে এর ব্যবহার ঘিরে ফ্রান্সের তরুণদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যেভাবে স্লোগানটির উৎপত্তি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্ন্যাপচ্যাটে প্রকাশিত একটি বার্তা থেকে স্লোগানটির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা চলার সময় বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
বার্তার শুরুতে ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। এরপর লেখা হয়, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’ বার্তাটিতে আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র ব্যবহার দেখা যায়, যা ফ্রান্সের তরুণদের কথ্যভাষার অনুকরণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বার্তাটি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের অনেকে এর স্ক্রিনশট নিয়ে পোস্ট করেন। তবে নিউইয়র্ক টাইমস বার্তাগুলোর মূল উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
পুলিশের নজরদারি নিয়ে ব্যঙ্গ
আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের সন্দেহ, বার্তাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে আসতে পারে। তাঁদের ধারণা, আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে কেউ তরুণদের ভাষা ও কথাবার্তার ধরন নকল করেছেন।
এ কারণে বিক্ষোভকারীরা বাক্যটিকে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁদের কাছে এটি আন্দোলনের ওপর নজরদারি এবং প্রতিবাদকারীদের সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের ধারণাকে উপহাস করার একটি উপায় হয়ে ওঠে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের বার্তা তাদের কোনো কর্মকর্তা পাঠিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা শনাক্ত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন। এভাবে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
কেন স্লোগানটি আলোচনায়
ফ্রান্সের তরুণদের একাংশের কাছে স্লোগানটি শুধু একটি কৌতুক নয়। তাঁদের মতে, এর মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসি তরুণদের মধ্যে বৈষম্য ও নজরদারি নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মতে, স্লোগানটির ভাষা তরুণদের স্বাভাবিক কথাবার্তার মতো নয়। এ কারণে অনেকে এটিকে তরুণদের ভাষা নকল করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। পরে সেই অস্বাভাবিক বাক্যই আন্দোলনকারীদের কাছে হাস্যরস ও প্রতিবাদের উপকরণ হয়ে ওঠে।
বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মতে, বার্তাটি কর্তৃপক্ষের পূর্বধারণার প্রতিফলন হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে বা ভাঙচুরে জড়িত হতে পারে, তা নিয়ে আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছে। প্যারিসের এক শিক্ষার্থীও স্লোগানটিকে তরুণদের ভাষা নকল করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে স্লোগান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেলজিয়াম ও জার্মানির অনুরূপ বিক্ষোভেও স্লোগানটি ব্যবহার করা হয়েছে। সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বাক্যটি উচ্চারণ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্লোগানটির জনপ্রিয়তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ও মিমের প্রভাবও তুলে ধরে। একটি কথিত বার্তা থেকে তৈরি হওয়া বাক্য কীভাবে আন্দোলনকারীদের পরিচয়, প্রতিবাদ এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে, ঘটনাটি তারই উদাহরণ।

