স্পোর্টস ডেস্ক

ড্র মানেই সাধারণত অমীমাংসিত লড়াই, যেখানে কেউ জয়ের উল্লাস নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারে না। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ড ও ইরানের মধ্যকার ম্যাচটি সেই প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিল। ২-২ গোলের এই ড্রয়ে ছিল নাটক, আবেগ, প্রতিরোধ আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার এক অনন্য গল্প।

ম্যাচের ৬৩তম মিনিটে নিউজিল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে, বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল ওশেনিয়ার দলটি। সেই মুহূর্তে ইদৃশ্যপটে হাজির হন ইরানের রামিন রেজাইয়ান। ডান প্রান্ত থেকে তাার নিখুঁত মাপা ক্রস খুঁজে নেয় ডি-বক্সের ভেতরে থাকা মোহামেদ মুহিবিকে। মুহিবির দুর্দান্ত হেড নিউজিল্যান্ডের রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে বল জালে জড়াতেই বিস্ফোরণ ঘটে সোফি স্টেডিয়ামে, প্রায় ৫০ হাজার ইরানি সমর্থকের সম্মিলিত উল্লাসে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্টেডিয়াম মুহূর্তেই যেন রূপান্তরিত হয় তেহরানের বিখ্যাত আজাদি স্টেডিয়ামে।

কাগজে-কলমে এই ম্যাচে ইরান ছিল ‘হোম টিম’। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এমন পরিচিত পরিবেশ পাওয়ার পেছনে ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসের বিশেষ সামাজিক বাস্তবতা। ক্যালিফোর্নিয়ার এই শহরটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইরানি ডায়াস্পোরার আবাসস্থল। দেশ ছেড়ে আসা প্রথম প্রজন্ম থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের ইরানি-আমেরিকানরা দলে দলে ভিড় করেছিলেন সোফি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে।

তাঁরা শুধু দর্শক ছিলেন না, পুরো ম্যাচজুড়ে হয়ে উঠেছিলেন দলের অদৃশ্য শক্তি। প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি প্রতিরোধ আর প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে গ্যালারি থেকে ভেসে আসা সমর্থনের ঢেউ ফুটবলারদের বাড়তি সাহস জুগিয়েছে। ফলে ভৌগোলিকভাবে ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্রে হলেও আবহ তৈরি হয়েছিল ইরানের ঘরের মাঠের মতোই।

এই ম্যাচের আবেগ অবশ্য শুধু ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্যালারিতে দেখা যায় ‘মিনাব ১৬৮’ লেখা একটি বড় ব্যানার, যা ইরানের সাম্প্রতিক জাতীয় শোকের প্রতীক হয়ে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাহজারেহ তাইয়েবেহ স্কুলে হামলায় প্রাণ হারানো ১৬৮ শিক্ষার্থীর স্মরণে এই বার্তা বহন করা হয়। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির প্রতিনিধিত্বকারীদের মধ্যেও এই স্মৃতির প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চেও ফুটবলারদের পোশাক ও সমর্থকদের ব্যানারে উঠে এসেছে সেই আবেগ।

তবে মাঠের লড়াইয়ে ইরানের শুরুটা ছিল হতাশার। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণে আধিপত্য দেখালেও মাত্র ৫ মিনিটেই পিছিয়ে পড়ে তারা। খেলার ধারার বিপরীতে এলিজাহ জাস্ট গোল করে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। আকস্মিক সেই ধাক্কায় কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় ইরানি সমর্থকদের গ্যালারি।

কিন্তু ইরান দ্রুতই বুঝিয়ে দেয়, তারা সহজে হার মানার দল নয়। চাপ সামলে ম্যাচের ৩২তম মিনিটে সমতায় ফেরে এশিয়ার পরাশক্তিরা। রামিন রেজাইয়ানের দুর্দান্ত এক প্রচেষ্টায় জালে বল জড়িয়ে যায়, আর ম্যাচ ফিরে আসে সমতায়।

দ্বিতীয়ার্ধে আবারও ইরানকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে নিউজিল্যান্ড। ৫৫তম মিনিটে ক্রিস উডের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়ায় এলিজাহ জাস্ট নিজের দ্বিতীয় গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। বিশ্বকাপে প্রথম জয়ের স্বপ্ন তখন আরও জোরালো হয়ে ওঠে অল হোয়াইটসদের।

কিন্তু পিছিয়ে পড়েও থেমে যায়নি ইরান। দুই মিনিট পরই সমতা ফেরানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। ৫৭তম মিনিটে পরপর দুটি শক্তিশালী আক্রমণ তৈরি করলেও নিউজিল্যান্ডের গোলরক্ষক ম্যাক্স ক্রোকোম্ব অসাধারণ দক্ষতায় তা প্রতিহত করেন। তবে সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এর ঠিক ছয় মিনিট পর মুহিবির সেই স্মরণীয় হেডে আবারও সমতায় ফেরে ইরান।

শেষ বাঁশি বাজার পর স্কোরবোর্ডে ২-২ লেখা থাকলেও ইরানি সমর্থকদের কাছে এটি ছিল জয়ের মতোই এক মুহূর্ত। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা জটিলতা এবং বেস ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার মতো নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের এই লড়াই শুধু একটি পয়েন্ট অর্জনের গল্প নয়।

এটি ছিল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হার না মানা এক দলের মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের গল্প।

Share.
Exit mobile version