নিজস্ব প্রতিবেদক
নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংঘটিত ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া। রাজনৈতিক পালাবদল, তদন্ত নিয়ে বিতর্ক, সাক্ষ্যগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা এবং মূল নথি সংক্রান্ত জটিলতায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে দেশের অন্যতম আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের মামলা।
২০০১ সালের ১৬ জুন শনিবার সন্ধ্যায় চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংঘটিত ওই বোমা হামলায় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা সাইদুল হাসান বাপ্পী, তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস আকতার হোসেন, সংগীতশিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু, আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, এবিএম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, চা দোকানি হালিমা বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, রাজিয়া বেগম, আব্দুস সাত্তার, এনায়েতউল্লাহ স্বপন ও স্বপন রায়সহ ২০ জন নিহত হন। আহত হন তৎকালীন সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী।
শামীম ওসমান ছাড়াও ওই হামলায় গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন যুবলীগ কর্মী রতন দাস এবং শামীম ওসমানের তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী চন্দন শীল। তিনি পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন।
ঘটনার পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। মামলায় তৎকালীন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, বর্তমান তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেম শকুসহ ২৭ জন বিএনপি নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়।
তবে ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তদন্ত শেষে পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানায়, অভিযুক্তদের কেউই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। পরে আদালত তাদের অব্যাহতি দেন।
একই সময়ে হামলায় নিহত চা দোকানি হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম বাদী হয়ে শামীম ওসমান, নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমানসহ ৫৮ জনকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেন। পরে উচ্চ আদালতে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন মামলার অগ্রগতি না থাকলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। চার বছর তদন্ত শেষে ২০১৩ সালে সংস্থাটি হত্যা ও বিস্ফোরক—দুই মামলায় মোট ৯৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয়।
অভিযোগপত্রে আগের আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে নতুন করে ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তারা হলেন—যুবদল কর্মী মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাই শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, জঙ্গি নেতা ওবায়দুল্লাহ রহমান, তার ভাই আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মুত্তাকিন এবং বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকু।
পরবর্তীতে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় মুফতি হান্নানের নাম মামলা থেকে বাদ পড়ে। জুয়েল বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
তবে ২০২০ সালে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী একেএম শামীম ওসমান নিজেই অভিযোগপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি আদালত ও সাংবাদিকদের বলেন, চার্জশিটে নির্দোষ ব্যক্তিদের নাম রয়েছে, আবার প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি তৈমুর আলম খন্দকার ও শওকত হাশেম শকুর সম্পৃক্ততার অভিযোগও নাকচ করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বছর মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) একেএম ওমর ফারুক নয়ন জানিয়েছিলেন, মামলায় ১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৪ সালের ১ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।
তবে নির্ধারিত দিনে রায় ঘোষণা হয়নি। পরে আদালত রায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। কারণ, বিচারিক কার্যক্রমের এক পর্যায়ে দেখা যায়, সম্পূরক অভিযোগপত্রের পূর্ণাঙ্গ মূল কপি আদালতের নথিতে নেই। দীর্ঘদিন ধরে মামলাটি মূল নথির পরিবর্তে ফটোকপির ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছিল।
সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে গতকাল এপিপি একেএম ওমর ফারুক নয়ন বলেন, আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সম্পূরক চার্জশিটের মূল কপি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তার পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণ এবং অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই রায়ের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বদলে গেছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের মধ্যে এ মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ও ভুক্তভোগী একেএম শামীম ওসমানও রয়েছেন।
শামীম ওসমান ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা-কর্মী গণঅভ্যুত্থানে সশস্ত্র হামলার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি। তিনি বর্তমানে সপরিবারে বিদেশে অবস্থান করছেন।
ফলে ২৫ বছর আগে নারায়ণগঞ্জকে রক্তাক্ত করা এই বোমা হামলার বিচার কবে শেষ হবে, আদৌ রায় হবে কি না—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।


