নিজস্ব সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জের সনাতন সম্প্রদায়ের তথাকথিত নেতা শংকর সাহার দ্বৈত রাজনীতি (ডুয়েল পলিটিক্স) সবার সামনে ফাঁস হয়ে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের দোসর বন্দর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের পক্ষে পুরোদমে নির্বাচনী গণসংযোগ চালিয়েছিলেন শংকর সাহা। কিন্তু চিহ্নিত এই আওয়ামী দোসর নির্বাচনে জয়লাভ করতে ব্যর্থ হওয়ায়, নির্বাচনের পর তিনি খুব সন্তর্পণে ভিড়ে গেছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের শিবিরে। শংকর সাহার এই দ্বৈত রূপে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সনাতন সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের একসময়ের চিহ্নিত গডফাদার শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যা মামলার জেলখাটা আসামি মাকসুদ হোসেনের সাথে সনাতন সম্প্রদায়ের কথিত নেতা শংকর সাহা ও বাপ্পী রায় চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজনের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ ইতিপূর্বেই মিলেছে।
বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় স্বৈরাচারের দোসর মাকসুদ চেয়ারম্যানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি শংকর সাহাকে। নির্বাচনের কিছুদিন আগে মাকসুদ হোসেনকে সাথে নিয়ে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন শংকর সাহা এবং সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সনাতনীদের মাঝে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। ক্ষুব্ধ সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজন জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গণহত্যা চালানো ওসমান পরিবার ও তাদের দোসরদের সাথে শংকর সাহার এই সখ্য কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।
তবে সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী শংকর সাহা যখন দেখলেন আওয়ামী দোসর মাকসুদ হোসেন নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ব্যর্থ হয়েছেন, তখন তিনি সুকৌশলে পাড়ি জমান বর্তমান এমপি আবুল কালামের বলয়ে। অতি সম্প্রতি শেষ হওয়া মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসবে শংকর সাহাকে দেখা গেছে এমপিকন্যা শামসুন্নুর বাঁধনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে। এতে করে শংকর সাহার ‘ডুয়েল পলিটিক্স’ সকলের সামনে পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গেছে।
অনুসন্ধান বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি শংকর সাহা শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি নারায়ণগঞ্জের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু—উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এই হিন্দু নেতা। তাঁকে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর পাশে যেমন দেখা যেত, তেমনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের পাশেও দেখা মিলত শংকর সাহার। নিজের সুবিধা আদায়ের জন্য সকল পক্ষেই তিনি ব্যালেন্স করে চলতেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ইউটার্ন করেন শংকর সাহা। আওয়ামী লীগ নেতা থেকে তিনি ধীরে ধীরে বিএনপিতে ঘেঁষতে থাকেন। সনাতন সম্প্রদায়ের স্বঘোষিত বিএনপি নেতা জয় কে রায় চৌধুরী বাপ্পীর সাথে সারাক্ষণ ওঠাবসা করতে থাকেন এবং নিজেকে বিএনপি সমর্থক প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। যদিও ৫ আগস্টের পূর্বে তাঁদের কাউকেই বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি।
দেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আগে নারায়ণগঞ্জে সনাতন সম্প্রদায়ের সকলে একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছে। সেখানে কোনো রাজনৈতিক বিভাজন ছিল না। কিন্তু ৫ আগস্টের পর শুরু হয় নতুন বিভক্তি। এ সময় বিএনপিপন্থী সনাতনী কিছু সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে। নারায়ণগঞ্জে এসব সংগঠনে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের ইতিপূর্বে বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে দেখা মেলেনি এবং তাঁরা কোনো মামলা-হামলার শিকারও হননি। কিন্তু তাঁরা ৫ আগস্টের পর বিএনপির পরিচয়ে সনাতন সম্প্রদায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে থাকেন। সেই নব্য বিএনপি সাজা গোষ্ঠীর সাথেই নিয়মিত ওঠাবসা করতে থাকেন সুচতুর শংকর সাহা।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত বছরের ১৫ মার্চ বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ এলাকায় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসব উদযাপন ফ্রন্ট’-এর। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়কে আহ্বায়ক এবং জয় কে রায় চৌধুরী বাপ্পীকে সদস্য সচিব করে ৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা হয় সেই অনুষ্ঠানে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাওসার আশা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই কমিটি ঘোষণা করেন। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা শংকর সাহা। এই কমিটি ঐতিহ্যবাহী লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান আয়োজনের সহ-আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পায়।
কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার শুরুতেই বিতর্কের সৃষ্টি করে স্নান উদযাপন ফ্রন্ট। স্নান চলাকালীন সময়ে উদযাপন ফ্রন্টের একটি পোস্টার সকলের নজরে আসে। সেই পোস্টারে খুনি ওসমান পরিবারের দোসর এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামি মাকসুদ হোসেনের ছবি দিয়ে লাঙ্গলবন্দ স্নানে আগত পুণ্যার্থীদের শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে এবং তাতে লেখা ছিল ‘নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী’। এই পোস্টারের নিচে লেখা ছিল ‘প্রচারে: মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসব উদযাপন ফ্রন্ট’।
গণহত্যা মামলার আসামির ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপানোয় উদযাপন ফ্রন্টের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বন্দরবাসী। অনেকের সাথে কথা বললে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর বন্দরের মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানো মাকসুদ চেয়ারম্যানের ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপানো হয়েছে এমন একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে, যার প্রধান একজন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেত্রী। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

