মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

একটি ঘোষণা, তারপর হঠাৎ আক্রমণ। গল্প শুরু হতেই থামে না এক মুহূর্তের জন্যও। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে একের পর এক যুদ্ধের দৃশ্যে এগিয়ে চলে ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার। প্রথম আধঘণ্টার এক বিপ্লবী সংঘর্ষের প্রতিক্রিয়া টেনে নিয়ে যায় পুরো সিনেমাজুড়ে। অপহরণ, পালানো, ধাওয়া আর এক বাবার মেয়েকে খুঁজে ফেরার যাত্রা—সব মিলিয়ে দর্শককে শ্বাসরুদ্ধ করে রাখে ছবিটি।

১৯৯০ সালে প্রকাশিত টমাস পিনচনের উপন্যাস ভাইনল্যান্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন পল টমাস অ্যান্ডারসন। গল্পে উঠে এসেছে আধুনিক আমেরিকার বাস্তবতা—বিপ্লব, অভিবাসন, দুর্নীতি, বর্ণবাদ আর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের ছায়া। গম্ভীর বিষয় নিয়েও সিনেমাটি তৈরি হয়েছে বিনোদনের ছন্দে, যা অ্যান্ডারসনের সবচেয়ে সহজবোধ্য কাজগুলোর একটি।

সিনেমার শুরুতেই দেখা যায়, ‘ফ্রেঞ্চ ৭৫’ নামে এক বিপ্লবী সংগঠন সীমান্তে অভিযান চালায়। এর নেতা পারফিডিয়া বেভারলি হিলস (টেয়ানা টেইলর)—এক আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীনচেতা, কিন্তু রাগে অন্ধ তরুণী। এই অভিযানে সে অপমান করে কর্নেল স্টিভেন লকজয়কে (শন পেন), যিনি পরিণত হন গল্পের নির্মম খলনায়ক ও বিকৃত প্রেমিকে। কর্নেলের বর্ণবাদী ঘৃণা আর পারফিডিয়ার প্রতি আকর্ষণ মিলেমিশে তৈরি হয় ভয়ংকর টানাপোড়েন।

এদিকে পারফিডিয়ার সঙ্গী বব ফার্গুসন (লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও) বিপ্লব চালিয়ে যায়, কিন্তু একসময় দল ভেঙে পড়ে। বন্দিজীবন সহ্য করতে না পেরে পারফিডিয়া পালিয়ে যায়, রেখে যায় নবজাতক কন্যা উইলাকে (চেইস ইনফিনিটি)। বব নতুন শহরে মেয়েকে নিয়ে গড়ে তোলে নতুন জীবন।

১৬ বছর পর গল্পে ফেরে কর্নেল লকজয়। ডানপন্থী এক শ্বেতাঙ্গ সংগঠনে যোগ দিতে চাইলে তাকে মুছে ফেলতে হয় অতীত। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ, নিজের অতীত মুছে ফেলার যুদ্ধ।

হলিউডে যেখানে বড় স্টুডিওগুলো সুপারহিরো বা সিক্যুয়েল নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার এক সাহসী ব্যতিক্রম। রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও ভণ্ডামিকে সরাসরি প্রশ্ন করা এমন চলচ্চিত্রের প্রযোজক ওয়ার্নার ব্রাদার্স—যা নিজেই বিস্ময়। সিনেমায় সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত স্পষ্ট—এখনকার আমেরিকায় চলছে একরকম ফ্যাসিবাদ। কিন্তু এ গল্প কেবল বর্তমানের নয়, অতীতেরও। ১৬ বছর আগেও ছিল একই দমননীতি, একই ভীতি, একই অন্যায়।

ছবিটি যেমন চিন্তা জাগায়, তেমনি বিনোদন দেয়। কিছু দৃশ্যে হাস্যরস এত নিখুঁত যে ভয়ও জাগায়। এক দৃশ্যে দেখা যায়, ব্যর্থ বিপ্লবী বব বিপ্লবের পরিকল্পনা ভুলে টিভিতে ব্যাটল অব আলজিয়ার্স দেখছে!

এটা কেবল রাজনৈতিক সিনেমা নয়, বরং এক মানবিক গল্প—যেখানে আদর্শ, ভালোবাসা আর দায়িত্বের লড়াই একসঙ্গে চলে। পারফিডিয়ার হাতে নিজের জাতির এক নিরাপত্তারক্ষীর মৃত্যু, আর সেই সুযোগে রাষ্ট্রের তাকে ব্যবহার করা—এই ঘটনাগুলোই সিনেমার মূল প্রশ্ন তুলে ধরে।

ডিক্যাপ্রিওর অভিনয় সংযত ও গভীর। বিপ্লবীর চেয়ে তিনি এখানে বেশি এক স্নেহময় পিতা। তাঁর সঙ্গে চেইস ইনফিনিটির সম্পর্ক সিনেমায় প্রাণ সঞ্চার করে। শন পেনও অসাধারণ—কঠিন মুখভঙ্গি, দাঁতে দাঁত চেপে কথা বলা, আর বিকৃত মানসিকতা—সব মিলিয়ে তিনি বাস্তবতার এক ব্যঙ্গচিত্র হয়ে উঠেছেন।

চিত্রগ্রাহক মাইকেল বাউম্যান দৃশ্য নির্মাণে ক্লোজআপ ও আলো ব্যবহার করেছেন নিপুণভাবে। সীমান্ত প্রাচীর বা মরুভূমির ধাওয়ার দৃশ্যগুলো চিত্রকর্মের মতো সুন্দর। জনি গ্রিনউডের সঙ্গীতও সিনেমার আবেগ বাড়িয়েছে—কখনো কোমল, কখনো টানটান উত্তেজনাপূর্ণ।

পল টমাস অ্যান্ডারসন প্রায় দুই দশক ধরে ভেবেছেন এই প্রকল্প নিয়ে। সময় লেগেছে, কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা বেড়েছে আরও। কারণ, যুদ্ধের তো শেষ নেই। যুদ্ধ চলতেই থাকে—একটার পর একটা।

Share.
Exit mobile version