নিজস্ব সংবাদদাতা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে এমন সংবাদ প্রকাশের পরই কাদের দ্রুত কলকাতা থেকে নয়াদিল্লি পৌঁছান এবং এই বৈঠকে অংশ নেন।
বৃহস্পতিবার (০৯ অক্টোবর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি প্রমোদ কুমার মিশ্র উপস্থিত ছিলেন। দুই নেতার মধ্যে আলোচনা কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।
বৈঠকে নরেন্দ্র মোদির কাছে ওবায়দুল কাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছেন। তার প্রধান দাবি ছিল, শেখ হাসিনাকে কোনোভাবেই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। এছাড়া, ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, রেশন কার্ড, শরণার্থী মর্যাদা এবং পর্যায়ক্রমে ভারতের নাগরিকত্ব প্রদানের মতো বিষয়।
কাদের বলেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে একটি ‘বাজে দৃষ্টান্ত’। কারণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ভারতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল এবং তার মূল্য এখন পরিশোধ করছে।
কাদের আরও উল্লেখ করেন, “ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শেখ হাসিনা মোদির নির্দেশ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেননি। মোদির ভরসাতেই শেখ হাসিনা ভোটারবিহীন নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। দমনমূলক শাসনসহ ভারতকে স্বার্থহীনভাবে সমর্থনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়েছেন।”
কাদের জোর দিয়ে বলেন, ভারতের প্রতি শেখ হাসিনার “আত্মত্যাগ” ও আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে যথাযথ মর্যাদায় ভারতে রাখতে হবে। ভারতকে আওয়ামী লীগ অনেক কিছু দিয়ে এসেছে, এখন ভারতের অন্তত কিছু প্রতিদান দেওয়া উচিত। শেখ হাসিনাকে কোনো প্রদেশের ভারপ্রাপ্ত মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান তিনি।
নরেন্দ্র মোদি এই বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, “গণঅভ্যুত্থানে প্রিয় ও বিশ্বস্ত বন্ধুর শোচনীয় পতন অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। আরও মর্মান্তিক হলো যখন এমন ঘটনা দেখা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। কিন্তু যখন কোনো দেশ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়নি, মানসম্মানের ঝুঁকি নিয়ে আমরা তাকে আশ্রয় দিয়েছি।”
ভারতের সংবিধানের সীমাবদ্ধতার কারণে শেখ হাসিনাকে কোনো প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে মোদি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমরা শেখ হাসিনাকে ভারতে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তিনি শুধু ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়, তিনি আপনজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলে তা হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত।”
কাদের অভিযোগ করেন, ভারতে এসেও নরেন্দ্র মোদির একান্ত অনুগত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা চরম আতঙ্ক ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছে। কারণ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রায়ই ভাষণে বলেন যে, অবৈধ বাংলাদেশিদের আটক করলে তিনি ‘উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটাবেন’। এই পরিস্থিতিতে ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দ্রুত নাগরিকত্ব প্রদানের বিকল্প নেই।
নরেন্দ্র মোদি নাগরিকত্ব প্রদানের দাবিটি বিবেচনা করার আশ্বাস দিলেও তীব্র বিরোধীতা করেন অমিত শাহ। ভোটের পরিস্থিতি উল্লেখ করে শাহ বলেন, “শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ আমাদের জন্য যা করেছে তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রেখেছি। আমৃত্যু মনে রাখব। কিন্তু নিজেদের ভোট হারানোর মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। তাই অবৈধ বাংলাদেশিদের ধরতে পারলে উল্টো করে পেটালেও, মানবতার স্বার্থে অবৈধ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধরলে সোজা করে ঝুলিয়ে পেটাব।”
প্রসঙ্গত, গত বছর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলে তিনি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাকে অনুসরণ করে তার মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য (এমপি) সহ অসংখ্য দলীয় নেতা-কর্মীও অবৈধভাবে ভারতে আশ্রয় নেন। সম্প্রতি মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে এমন সংবাদ প্রকাশের পর ভারতে আশ্রিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
© The New York 24 | Real News, Twisted Truths

