দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বেসরকারি খাতকে আরও গতিশীল করতে বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যেই ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মন্থর অর্থনীতিকে চাঙা করা এবং বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ নামে গঠিত এই তহবিলের আওতায় আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া, তবে পুনরায় চালু করা সম্ভব—এমন শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।
২০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল গঠন করা হয়েছে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প সুদে ব্যাংকগুলোর কাছে অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ঋণ প্রদান করবে।
বাংলাদেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংক এই স্কিমে অংশ নিতে পারবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩-এর সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে স্কিমটি পরিচালিত হবে এবং এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর।
বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের যেসব প্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কিংবা ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না, তারা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবে। এছাড়া দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ শিল্প অধিগ্রহণ করে চালু করলেও তারা এই স্কিমের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবে।
ঋণ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে উৎপাদন সক্ষমতা, বন্ধ হওয়ার কারণ, বাজার পরিস্থিতি এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বিস্তারিতভাবে যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে, তবে না থাকলেও ব্যাংক নিজস্ব যাচাইয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
খেলাপি ঋণগ্রহীতা, অর্থপাচার বা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কোনো প্রতিষ্ঠান এই তহবিল থেকে ঋণ পাবে না। একই সঙ্গে অন্য কোনো পুনরর্থায়ন স্কিমের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
এই তহবিলের অর্থ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ব্যয় এবং রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে ব্যবহার করা যাবে। বেতন বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের অর্থ দেওয়া হবে এবং তা সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবে জমা করতে হবে। কোনো ধরনের নগদ লেনদেনের সুযোগ থাকবে না।
একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর, তবে সন্তোষজনক কার্যক্রমের ভিত্তিতে তা নবায়নের সুযোগ থাকবে। ব্যাংক পর্যায়ে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ। প্রথম ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড থাকবে, এরপর সুদ আদায় শুরু হবে।
ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রমে কঠোর তদারকির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত প্রতিবেদন দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। ঋণের অপব্যবহার বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো নিজস্ব বিনিয়োগ পদ্ধতিতে এই স্কিম বাস্তবায়ন করতে পারবে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্কিমের শর্তাবলি পরিবর্তন বা সংশোধনের ক্ষমতা সংরক্ষণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

