রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—উত্তরাঞ্চলের এই পাঁচ জেলায় নন-ইউরিয়া সারের সংকটে বিপর্যস্ত কৃষকেরা। সময়মতো আলু ও ভুট্টা রোপণের প্রস্তুতি নিতে না পারায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, “অতিরিক্ত টাকা দিলেও সার পাওয়া যাচ্ছে না।” অন্যদিকে কৃষি বিভাগ দাবি করছে, “দেশের কোথাও সারের সংকট নেই।”
এ দুই বিপরীত বক্তব্যের মাঝখানেই আজকার কৃষকের বাস্তবতা আটকে আছে—মাঠে যেখানে সার নেই, কাগজে সেখানে সারের পাহাড়।
বিএডিসি কর্মকর্তারা বলছেন, গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। কিন্তু নিজেরাই আবার স্বীকার করছেন, চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ঘাটতি স্বীকার না করেও তারা স্বীকার করছেন—সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, কিছু অসাধু ডিলার মুনাফার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি গুদামেই পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে সেই সার বাজারে পৌঁছায় না কেন? সরকার কি জানে না—কৃষকের হাতে পৌঁছাতে না পারা সার মানেই অচল নীতি ও দুর্বল মনিটরিং?
মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। রংপুর থেকে লালমনিরহাট—সব জায়গায় একই চিত্র। কৃষকেরা ডিলারের কাছে গেলে শুনছেন, “সার শেষ।” অথচ সেই একই সার পাওয়া যাচ্ছে খুচরা দোকানে, কেজিতে ৮–১০ টাকা বেশি দামে। সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে এই অতিরিক্ত মূল্য কৃষকের ঘামঝরা পরিশ্রমের সঙ্গে নির্মম পরিহাস ছাড়া কিছু নয়।
ডিলাররা বলছেন, সংকটের মূল কারণ বরাদ্দের স্বল্পতা। চরাঞ্চলে এখন আবাদ বেড়েছে, ফসলের ধরনও বদলেছে—কিন্তু সরকারি বরাদ্দ একই রয়ে গেছে। যুক্তিটা যুক্তিসংগত, তবে প্রশ্ন থাকে—খুচরা বিক্রেতাদের হাতে সরকারি সার যায় কীভাবে? কৃষকের পকেট থেকে যে বাড়তি টাকা যাচ্ছে, সেই দায় সরকারের।
প্রশাসন বলছে, মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবে কৃষকেরা এখনো সারের জন্য লাইনে দাঁড়ান, আবার ফিরে যান শূন্য হাতে। সাময়িক অভিযান হয়তো কয়েকটি দোকানে জরিমানা আনতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে না।
সারের সংকট মানে ফসলের ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি। অথচ এই ক্ষতির দায় কেউ নিচ্ছে না—না কৃষি বিভাগ, না বিএডিসি, না ডিলাররা। সবাই অন্যের দিকে আঙুল তুলছে, কিন্তু কৃষক একা পড়ে যাচ্ছে নিজের মাঠে, নিজের দুশ্চিন্তায়।
ডিলাররা মনে করিয়ে দিয়েছেন ২০০৯ সালের সার নীতির কথা। সেই নীতিমালা আজও হালনাগাদ হয়নি, অথচ কৃষির বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। নতুন আবাদ, নতুন ফসল, নতুন চাহিদা—কিন্তু নীতিনির্ধারকেরা এখনো পুরোনো ক্যালকুলেটরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মাপছেন।
উত্তরবঙ্গের কৃষকেরা যখন মাঠে সার খুঁজে ফিরছেন, সরকারি কর্মকর্তারা তখন কাগজে “পর্যাপ্ত মজুদের” সান্ত্বনা লিখছেন। এই প্রশাসনিক আত্মতুষ্টি দেশের কৃষিকে ধীরে ধীরে অবিশ্বাসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সারের সংকট কোনো একদিনের সমস্যা নয়, এটি দুর্বল নীতি, সীমিত বরাদ্দ, মনিটরিংয়ের ব্যর্থতা ও বাণিজ্যিক লোভের সমষ্টি। এখনই যদি সরকার মাঠের বাস্তবতা বুঝে, কৃষকনির্ভর পরিকল্পনা নেয়, তাহলে হয়তো আগামী মৌসুমে কৃষকের মাঠে ফসল ফুটবে, হতাশা নয়। না হলে, উত্তরবঙ্গের এই সংকট খুব শিগগিরই খাদ্যশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করবে।

মনসুর চৌধুরী
কৃষি অর্থনীতি বিশ্লেষক।

