নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতি গঠন ও দেশের অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এক প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভায় তিনি শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর নিজের প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে কেবল রাজপথের আন্দোলন নয় বরং রাজনীতিকে এখন সংসদে নিয়ে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন যে কোনো কিছু গড়তে হলে স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। কারণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যা কিছু সৃষ্টি হয়, তা দ্রুতই ভেঙে যায়। তিনি বলেন যে আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিক্ষার্থীদের শুধু দক্ষ হলেই চলবে না বরং তাদের শক্ত হাতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ক্ষেত্রে সঠিক জনমত তৈরি করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের জীবনমানের সংকটের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের সম্পদ পাচার ও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে একটি সিট পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের যে তীব্র সংগ্রাম করতে হয় তার জন্য তিনি বিগত সময়ের অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নজিরবিহীন দুর্নীতিকে দায়ী করেন। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্নীতি এবং প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন যে এই বিশাল অর্থ পাচার না হলে শিক্ষার্থীদের আবাসন ও খাবারের সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করা সম্ভব হতো।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিকে এই মুহূর্তে কিছুটা অবাস্তব আখ্যা দিয়ে তিনি জানান যে রাতারাতি সব পরিবর্তন সম্ভব না হলেও সরকার এই অপসংস্কৃতির লাগাম টেনে ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি মনে করেন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে কেবল আইনের মাধ্যমে দুর্নীতি শতভাগ দূর করা কঠিন।
শিক্ষার বৈশ্বিক মান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং নিয়ে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দেন। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে অতীতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানে পিছিয়ে পড়েছে। এই অবস্থার উত্তরণে আগামীতে কেবল একাডেমিক ফলাফল এবং মানসম্মত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য তিনি উপাচার্যের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান।
এছাড়া বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি গ্রাজুয়েটদের এগিয়ে রাখতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা শেখার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন সঠিক কারিকুলাম ও দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।
মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী নিজের পরিবারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি জানান যে তার কন্যা জাইমা রহমান দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করলেও পারিবারিক সচেতনতার কারণে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলার নামসহ দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করলেও নিজ ভাষার প্রতি আকর্ষণ হারানো একটি মানসিকতার বিষয় এবং এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বড় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তুলতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের সংসদ ভবন পরিদর্শনের জন্য নেওয়া বিশেষ উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন যে একদিন সারা দেশের শিক্ষার্থীরা সংসদীয় প্রক্রিয়া ও এর ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করবে।
মতবিনিময় সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অত্যন্ত সহজভাবে মিশে যান এবং তাকে ‘মাননীয়’ সম্বোধনের পরিবর্তে কেবল ‘প্রাইম মিনিস্টার’ বলার সুযোগ দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান তারা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান এবং দেশ গঠনে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো কী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সভায় শিক্ষার্থীরা তাদের মনের কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদানের মাধ্যমে এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে যা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক নতুন রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বার্তা বয়ে এনেছে।

