নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের কৃষি খাতকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ‘কৃষক কার্ড’ নামক এই বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি নগদ ভর্তুকি, কৃষিঋণ ও সার-বীজসহ অন্তত ১০ ধরনের সেবা পাবেন। আগামীকাল পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (১২ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এই মেগা প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন। কৃষিমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ‘কৃষক ডেটাবেজ’ তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে সরকারের নীতিনির্ধারণে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
সরকার জানিয়েছে, প্রকল্পটি প্রাক-পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন—এই তিন ধাপে সম্পন্ন করা হবে। প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এই পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বার্ষিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে। তালিকাভুক্ত ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের মধ্যে ২০ হাজার ৬৭১ জন এই সুবিধার আওতায় আসছেন।
কৃষিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, এই নগদ সহায়তা মূলত একটি সামাজিক সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করবে যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকরা উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন। এই অর্থ কেবল কৃষিকাজেই ব্যয় করা যাবে এবং এটি গ্রহণে অন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পেতে বাধা সৃষ্টি হবে না। তবে মাঝারি ও বড় কৃষকরা এই নগদ সহায়তার বাইরে থাকলেও কার্ডের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরিত এই ‘কৃষক কার্ড’ মূলত একটি ডেবিট কার্ড হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে কৃষকরা স্থানীয় ডিলারের কাছ থেকে ‘পয়েন্ট অব সেল’ (পিওএস) মেশিনের মাধ্যমে সার, বীজ ও মৎস্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে পারবেন। ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে।
সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সাশ্রয়ী মূল্যে সেচ ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকরা মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বাজারদরের তাৎক্ষণিক তথ্য পাবেন। এছাড়া কৃষি বীমা ও বিশেষ প্রশিক্ষণ সুবিধাও এই কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। কৃষি খাতের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে প্রথম ধাপে টাঙ্গাইল, বগুড়া, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, পিরোজপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, রাজবাড়ী, মৌলভীবাজার ও জামালপুর জেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
আগামী চার বছরের মধ্যে সারাদেশের সব কৃষকের হাতে এই স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। কৃষিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই কার্ড ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে এবং কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে।

