নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাভাষী লোকজনকে বাংলাদেশি দাবি করে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ভারত। এমন পরিস্থিতিতে আজ সোমবার (৮ জুন) নয়াদিল্লিতে বৈঠকে বসছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। চলমান প্রেক্ষাপটে পুশইন ইস্যুই বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভারত সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাভাষী বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। এতে সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিত ফিরিয়ে আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, সব ক্ষেত্রেই নির্ধারিত আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কিন্তু ভারতের অসহযোগিতায় বিদ্যমান প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পুশইন নিয়ে আলোচনা করতে গত বছরই ভারতকে দ্বিপক্ষীয় কনস্যুলার বৈঠকের প্রস্তাব দেয় ঢাকা। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নয়াদিল্লির কোনো সাড়া দেয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি হলে তাকে অবশ্যই যাচাই-বাছাই শেষে এবং স্বীকৃত প্রক্রিয়া মেনে ফেরত পাঠাতে হবে। ভারতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একই নীতি অনুসরণ করতে চায়।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভারত এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত প্রায় ২ হাজার ৮০০ ব্যক্তির তথ্য দিয়েছে। তবে তালিকায় প্রায় ২৫০ জনের নাম একাধিকবার রয়েছে। আবার প্রায় ৪০০ জনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিচয় তথ্যই নেই। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জনের নাগরিকত্ব যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু নামের ভিত্তিতে কারও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একজন ব্যক্তির ঠিকানা, পারিবারিক পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভারত থেকে সেই তথ্য দেওয়া হয়নি।
আরেকটি বড় অভিযোগ কনস্যুলার অ্যাকসেস নিয়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সব সময় দেওয়া হচ্ছে না। অথচ আন্তর্জাতিক রীতিতে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
পুশইনের ঘটনায় গত সপ্তাহে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র দেয় বাংলাদেশ। সেখানে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানানো হয়।
প্রতিবাদপত্রে ঢাকা বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ক্ষুণ্ন করছে এবং সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে এমন ঘটনা গঠনমূলক পরিবেশের জন্যও সহায়ক নয়।
বাংলাদেশ সরকার জোর দিয়ে বলেছে, প্রত্যাবাসনের সব প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা এবং মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসারে সম্পন্ন হতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তে জোরপূর্বক লোক ঠেলে দেওয়ার ঘটনা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
এর আগে আসাম সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল ভারত। আন্দামান সাগরে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

