প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রোগীদের প্রতি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমেই দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালী করতে চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং রোগীদের প্রতি সহমর্মী আচরণ অত্যন্ত জরুরি।
শনিবার (১০ জুলাই) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢামেক মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইতিহাস ও অবদান নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থীর আঁকা আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবা দেশে নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসকদেরই আস্থা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, আইন প্রয়োগ করে মানুষের আস্থা অর্জন করা যায় না। চিকিৎসকদের মানবিক আচরণ, আন্তরিক সেবা এবং মানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমেই দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবেন।
তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি শুধু হাসপাতাল দিয়ে গড়ে ওঠে না। পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনও মানুষের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতিতে সরকার স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো বিষয়ে আগাম সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনেক রোগ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু বাজেট বৃদ্ধি নয়, চিকিৎসা ব্যয় কমাতেও সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটরসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বর্তমানে অনেক উপজেলা হাসপাতালে শয্যা সংকট থাকায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য শহরমুখী হতে হয়। এ সমস্যা সমাধানে হাসপাতাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিশু স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্য পদ পূরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকরাই প্রকৃত অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ও আন্তরিক ব্যবহার রোগীর কাছে ওষুধের মতো কার্যকর হয়ে ওঠে। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি চিকিৎসকদের মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা।
তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু চিকিৎসক তৈরি করেনি, বরং শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
এর আগে সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চিকিৎসক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

