রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার (১২ জুলাই) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গুণগত ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা একটি দেশের প্রধান সম্পদ ও শক্তি। এটি উন্নয়নের ভিত্তি এবং সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ও অদক্ষ জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জনসংখ্যার আকারের ওপর নির্ভর করে না; বরং জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, অদক্ষ ও বেকার জনসংখ্যা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শ্রমবাজার, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তাই ভারসাম্যপূর্ণ জনসংখ্যা নিশ্চিত করা এবং এর গুণগত মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের অগ্রযাত্রার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার ঘোষিত ১৯ দফা সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তি কর্মসূচির অন্যতম দফা ছিল জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ।
তিনি বলেন, ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ গঠন এবং জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল অর্জনে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি ও নারী শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অবকাঠামোর তুলনায় দেশের জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। এর সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পরিবেশগত ঝুঁকি, সীমিত বিনিয়োগ ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। জনমিতিক লভ্যাংশের এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তরুণদের দক্ষ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও শ্রমবাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলে এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যা তরুণদের দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম করে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনসংখ্যার বিশাল ভিত্তি, প্রজনন হার স্থিতিশীল রাখা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, সরকার স্বাস্থ্যকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এবং ‘চিকিৎসার অভাবে কোনো মৃত্যু নয়’ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত পরিবার, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সুশাসন—এই ছয়টি ভিত্তিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারলেই জনসংখ্যা জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং। স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা।

